নবম শতকে মনের রোগের বিশ্লেষণ করেছিলেন আল বালখি

ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয় ৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়কালে ইসলাম ধর্মের নবজাগরণ ঘটেছিল। শিল্প ও সৃজনশীলতা থেকে অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্ত ক্ষেত্রেই তখন নবজাগরণ ঘটেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দতে খলিফা হারুণ অল রশিদের রাজত্বকাল শুরু হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই নবজাগরণ শুরু। এই নবজাগরণ ইসলামকে প্রভূত বিদ্বান, বহু-বিদ্বজন, চিকিৎসক , বহুভাষাবিদ প্রভৃতি উপহার দিয়েছিল। 

আবু জায়েদ আল বালখি তাঁদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন। ভূগোল, চিকিৎসাশাস্ত্র , ফিলোজফি, থিওলজি, রাজনীতি, ব্যাকরণ, সাহিত্য ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর ভূয়সী বুৎপত্তি ছিল। 

৮৪৯ খ্রিস্টাব্দ পারস্যের বলখ প্রদেশের শামিসিতিয়ান গ্রামে তাঁর জন্ম। বর্তমানে গ্রামটি আফগানিস্তানের অন্তর্গত। সারাজীবনে আবু জায়েদ ৬০-এর বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি রচনা করেছেন। তবে তার বেশিরভাগই আর পাওয়া যায় না, খুব অল্প সংখ্যক কাজ আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। 

তাঁর জ্ঞানচর্চার যে সামান্য অংশ আমরা জানতে পারি তার মধ্যে অন্যতম হল ভৌগলিক মানচিত্র ব্যবস্থা এবং অধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত তাঁর কিছু কিছু কাজ। দুটি বিষয়েই তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল অনবদ্য। 

আল বালখির জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনীকার ইয়াকুট আল হামাউই। যদিও তাঁর জীবনীর মধ্যে বালখির শৈশব নিয়ে বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। কেবল তাঁর জন্মস্থান ও পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা সম্পর্কে জানা যায়। তবে তাঁর কৈশোর ও তৎকালীন পড়াশুনো নিয়ে বিশদে জানা যায়। কিশোর বালখি বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের নানা বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন।  ইয়াকুটের মতে, বালখির স্বভাব ছিল শান্ত ও লাজুক। বর্তমান সময়ে জন্মালে বালখিকে অন্তর্মুখী বলা হত। 

আল বালখির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের নাম ‘মন ও শরীরের উন্নতিসাধন‘ (মাসালিহ আল-আবদান ওয়া আল আনফুস) । এই পান্ডুলিপিতে আল বালখি প্রথমে শরীরের উন্নতির কথা বলেন, তারপর শরীরের উন্নতি ও অধ্যাত্মবাদের মাধ্যমে কীভাবে মানসিক উন্নতি করা যায় সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই বইটি এক অমূল্য সম্পদ!

নিম্নলিখিত কতগুলো তত্ত্ব আল বালখির এই বইটি থেকে পাওয়া যায়ঃ

১। মানসিক সমস্যা ও তার সঠিক সমাধানঃ
বর্তমান সমাজে মানসিক সমস্যা এখনও বেশ বড়সড় একটি ট্যাবু। এখনও কারোর মানসিক সমস্যা হলে তাকে মানুষ আলাদা না করে দিক, একটু অন্যরকম চোখেই দেখে। সেই জন্যই চিকিৎসাশাস্ত্র এখন মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিক অসুখ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছে। মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে. তাও, সামাজিক ভাবে আমরা এখনও মানসিক সমস্যাকে মেনে নিতে পারি না। আল বালখি কিন্তু বহু বছর আগেই এই নিয়ে লিখে গিয়েছেন। তাঁর মতে, মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারলেই অসুখের সঙ্গে সহজে লড়াই করা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি সেরে ওঠেন।

২। মন ও শরীরেরর সংযোগঃ
বর্তমানে ডাক্তাররা বলে থাকেন যে সমস্ত অসুখের বীজ লুকিয়ে রয়েছে মনে। আল বালখি বহুদিন আগেই এই কথা বলে গিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘যদি মন অসুস্থ হয় তাহলে শরীর সমস্ত স্বাভাবিক কাজ থেকে প্রতিহত হয়। মন ও আত্মায় আঘাত লাগলে শরীরও বিকল হয়ে পড়ে।‘ বলা চলে, তৎকালীন যুগে, সাইকোসোমাটিক অসুস্থতার কথাও তিনি লিখে গিয়েছিলেন।

৩। অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারঃ
বর্তমানে এই মানসিক সমস্যার কথা আমরা সকলেই জানি। আল বালখিও এর কথা লিখে গিয়েছিলেন। এমনকী, সাইকাট্রিক ও সাইকোলজিকাল অসুস্থতা হিসাবে বর্তমান চিকিৎসকরা যে যে লক্ষণের কথা বলেন, আল বালখি প্রত্যেকটিই তাঁর বইতে বলে গিয়েছিলেন।
ক্রমাগত নেগেটিভ ভাবনা, উদ্বেগ, হঠাত করে ভয় পাওয়া, যা নয় তাই ভেবে কষ্ট পাওয়া এই প্রত্যেকটি লক্ষণই তাঁর বইতে ভাল করে লেখা রয়েছে। 

আল বালখিকে বলা চলে প্রাচীন যুগের প্রথম বিদ্বজন যিনি মানসিক সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। লিখে গিয়েছেন তার নানা সমাধান। অধ্যাত্মবাদ, মনন ও শরীরের সংযোগসাধন করতে চেয়েছেন নিজের লেখার মধ্যে। 

 এর থেকে বোঝা যায় ইসলামের স্বর্ণযুগ কতটা উন্নত ছিল। আমরা এক উন্নত সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে চলেছি নিজেদের জীবনে।