নবীজির নবুয়ত-পূর্ব জীবন এবং সুরাহা প্রদানে দৃষ্টান্ত

বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে সমস্ত গুণাবলী বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মধ্যে এককভাবে সেসকল বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান ছিল। তিনি সৎ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন , সত্যবাদিতা, গভীর মমতায় একগুচ্ছ মিনার। চিন্তার পরিছন্নতা, পরিপক্কতা, জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তার মধ্যে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো । সেসময় আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, পাশবিক প্রবণতা দমনের জন্য হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। নবীজি এতে যোগদান করেন এবং এই সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে তিনি বকরি চড়াতেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চরাতেন সেগুলো ছিল বনি সাদ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বরকিও চরাতেন। এরপর সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। মোহাম্মদ অল্পসময়ের মধ্যেই ব্যবসায় ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। নানা সময়ে ব্যবসার জন্য তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহারাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। তার ব্যবসায়িক এবং চারিত্রিক সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ সুখ্যাতির কারণে খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ নিজের ব্যবসায়িক সফরে যাওয়ার জন্য নবীজি কে অনুরোধ করেন। নবীজি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদিজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান। খাদিজা মাইসারার মুখে মোহাম্মদের সততা, ন্যায় পরায়ণতা এবং ব্যক্তিত্বর ভূয়শী প্রশংসা শুনে অভিভুত হন। তাছাড়াও ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। একপর্যায়ে তিনি মোহাম্মদ কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপারে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন।

নাফিসার কাছে শুনে মুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন জানাবেন। নবীজী তার চাচার সাথে কথা বলে বিয়েতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ছিল ৪০ বছর, আর নবীজির বয়স ছিল ২৫ বছর। খাদিজা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত তিনি আর কোন বিয়ে করেননি। খাদিজার গর্ভে নবীজির ৬ সন্তান জন্মগ্রহণ করে। যার মধ্যে চারজন মেয়ে এবং দুইজন ছেলে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসিম, জয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ। ছেলে সন্তান দুজনই শৈশবে মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে সবাই ইসলামী যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে ও একমাত্র ফাতিমা ব্যতিত সকলেই নবীজির জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করে।

নবীজির বয়স যখন ৩৫ তখন কা’বা গৃহ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । বেশ কিছু কারণে কাবাগৃহের সংস্কারের কাজ শুরু হয়। পুরনো ইমারত ভেঙে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়। এভাবে পুনঃনির্মাণের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ (পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোন গোত্রের লোক এ কাজটি করবে তা নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের ভেতরে কোন্দলের সৃষ্টি হয়। নির্মাণকাজ সকল গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবৎ এ বিবাদ অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি নামক এক ব্যক্তি একটি সমাধান নির্ধারণ করে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। হেরা গুহা থেকে কয়েক দিনের নির্জনবাস ও ধ্যান শেষে ঘরে ফেরার পথে পরদিন ভোরবেলা মুহাম্মদ (সাঃ)-দ্বার দিয়েই কাবায় প্রবেশ করলেন। সবাই ভাবলেন নিশ্চয়ই এখন সমস্যার একটা সুন্দর সমাধান বেরুবে। সবাই একবাক্যে তাঁর সালিশ মেনে নিলেন। মুহাম্মদ গোত্রপতিদের একটি চাদর আনতে বললেন। চাদর আনা হলে তিনি পাথরটি চাদরের ওপর রাখলেন। সব গোত্রপ্রধানকে চাদর ধরে পাথরটি যথাস্থানে নিয়ে যেতে বললেন। যথাস্থানে নিয়ে যাওয়ার পর সবাই চাদর ধরে পাথরটি উঁচুতে তুলে ধরলেন। এরপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এভাবে একটা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হলো। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি যুদ্ধংদেহী প্রতিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্থাপনে তার দক্ষতার প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।