নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে অন্যের ভুল সংশোধন করতেন (১ম পর্ব)

morning sun

মানুষ মাত্রই ভুল। এ কথাটি আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। ইসলামের দৃষ্টিতেও কথাটি শতভাগ সঠিক। ইসলাম ভুল হওয়াকে সমর্থন করে। কিন্তু ভুলের উপর হঠকারিতা সমর্থন করে না। কোনো ভুল হওয়ার পর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনিও ভুল ক্ষমা করে দিবেন বলে ওয়াদা করেছেন।

কোনো সময় তো ভুল সংশোধনের বিষয়ে মানুষ নিজ থেকেই বুঝতে পারে আবার কোনো সময় তাকে ভুলের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এই স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়েই অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তাই ভুল সংশোধন যদি হয় নববী আদর্শে তবে তা সর্বদাই কল্যাণ বয়ে আনবে। তাই এই নিবন্ধে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে অন্যের ভুল সংশোধন করতেন সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল।

১) ভুল সংশোধনে দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণ এবং শিথিলতা প্রদর্শন না করা

ভুল সংশোধনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন। দেরি করে বর্ণনা করা তাঁর জন্য মোটেও বৈধ ছিল না। সকলের সামনে সত্য ও ন্যায়কে তুলে ধরা এবং ভাল, মন্দ স্পষ্টরূপে নির্দেশ করা তাঁর আবশ্যিক কর্তব্যের মধ্যে ছিল। অন্যের ভুল সংশোধনে বহুক্ষেত্রে তিনি যে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, অনেক ঘটনাই তার প্রমাণ বহন করে। যেমন সালাতে ভুলকারীর ঘটনা, বনু মাখযূম গোত্রের চার মহিলার ঘটনা, যাকাত আদায়ে ইবনুল লুতাইবিয়ার ঘটনা। উসামা(রাযিঃ) কর্তৃক ভুলক্রমে একজন কালেমা পাঠকারীকে হত্যার ঘটনা, তিন ব্যক্তি নিজেদের উপর কঠোরতা আরোপ ও সংসার ত্যাগের সংকল্প করলে তাদের সংশোধনের ঘটনা ইত্যাদি। দ্রুত সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ না নিলে অনেক সময় ভুল সংশোধনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক সংশোধনে যে উপকারিতা পাওয়া যেত তার আর দেখা মেলে না। অনেক সময় সংশোধনের সুযোগ চলে যায় এবং বিলম্বের কারণে তার প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।

২) ভুল করা ব্যক্তিকে শরী‘আতের বিধান জানিয়ে দেওয়া

গুনাহে নিমজ্জিত হলে অনেক সময় মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে শরী‘আতের অনেক বিধিবিধান গায়েব হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বারবার শরী‘আতের মূলনীতির ঘোষণা দিলে এবং শরী‘আতের বিধিবিধান ভাল করে বললে যারা ভুল করেছে তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে এবং ভুলকারীর মধ্যে যে উদাসীনতা দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “মানুষ যেন তার ভাইকে সাহায্য করে চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত হোক। যদি সে অত্যাচারী হয় তবে তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। এটাই হবে তার জন্য সাহায্য। আর যদি সে অত্যাচারিত হয়, তবে অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে তাকে সাহায্য করবে।”

৩) উপদেশ ও ভয় দেখানোর মাধ্যমে ভুলের প্রতিকার

উসামা(রাযিঃ) বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে একটি অভিযানে প্রেরণ করেন। আমরা যখন জুহায়না গোত্রে পৌঁছলাম তখন আমি এক ব্যক্তিকে আটক করার সাথে সাথে সে বলে উঠল, ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’। কিন্তু এরপরও আমি তাকে হত্যা করলাম। পরে এজন্য আমার মনে অনুশোচনা সৃষ্টি হল। বিষয়টি আমি নবীজীর নিকট বললাম। তিনি একথা শুনে বললেন, সে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? আমি বললাম, ‘সে তো অস্ত্রের ভয়ে কালেমা বলেছিল।’ তিনি বললেন, তুমি কি তার অন্তর ফেড়ে দেখেছিলে যে, সে অন্তর থেকে বলেছিল কিনা? তিনি বারবার এ কথাটির পুনরাবৃত্তি করায় আমার মনে হচ্ছিল, ‘হায় আমি যদি ঐ দিন মুসলমান হতাম!’

আল্লাহর ক্ষমতার কথা বলাও উপদেশের মাধ্যমে ভুল সংশোধনের ভেতর পড়ে। একটি উদাহরণ দেখুন। আবু মাসঊদ আনসারী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ‘আমি আমার এক গোলামকে মারছিলাম। তখন আমার পেছন থেকে একজনকে বলতে শুনলাম- হে আবু মাসঊদ! জেনে রাখ, হে আবু মাসঊদ! জেনে রাখ। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বললেন, তার

উপর তোমার যতটা ক্ষমতা আছে তার তুলনায় অবশ্যই আল্লাহ তোমার উপর বেশী ক্ষমতাবান।” এ ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর থেকে আর কখনও আমি কোনো গোলামকে মারিনি।

৪) ভুল করা ব্যক্তির উপর দয়া-মমতা প্রকাশ করা

ভুল করার ফলে যে খুব অনুশোচনায় করে, আফসোসে কাতর হয়ে পড়ে এবং যার কথাবার্তায় তওবার বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ে তার ক্ষেত্রে এমনটা করা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে কেউ স্বীয় ভুল স্বীকার করলে তিনি তার প্রতি দয়াপরবশ হতেন।