নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে অন্যের ভুল সংশোধন করতেন (২য় পর্ব)

dreamstime_s_689318

৫) ভুল করা ব্যক্তির সাথে কোমল আচরণ

কেউ ভুল করলে তার প্রতি কঠোর ও মারমুখী না হয়ে ধীরস্থিরভাবে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন তার সাথে কড়াকড়ি করলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি আমরা মসজিদের মধ্যে এক বেদুঈনের পেশাব করে দেওয়ার ঘটনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি।

আবু হুরায়রা(রাযিঃ) বলেন, ‘জনৈক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দেয়, তখন লোকেরা তার উপর হামলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমরা প্রেরিত হয়েছ নম্র আচরণ করতে, কঠোর আচরণের জন্য তোমাদেরকে প্রেরণ করা হয়নি।” এখানে ভুলের প্রতিবিধানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসৃত নীতি ছিল নম্রতা অবলম্বন ও কঠোরতা পরিহার। এ হাদীস থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহশীলতা এবং সদাচারের পরিচয় মেলে।

৬) ভুলের ভয়াবহতা বর্ণনা করা

এক সাহাবী বর্ণনা করেন, তাবূক যুদ্ধকালে কোনো এক মজলিসে এক ব্যক্তি বলে উঠল, আমাদের এসব ক্বারীদের মত খানাপিনায় পেটুক, কথাবার্তায় মিথ্যুক এবং যুদ্ধে ভীরু কাপুরুষ দ্বিতীয় আর কাউকে আমরা দেখিনি। ঐ মজলিসেই এক ব্যক্তি এ কথার প্রতিবাদে বলল, তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তো মুনাফিক। আমি একথা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দেব। ইতিমধ্যে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর(রাযিঃ) বলেন, আমি তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের উষ্ট্রীর হাওদা ধরে ঝুলে থাকতে দেখেছি। পাথরের আঘাতে তার পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল, আর সে মুখে বলছিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কেবল আবোল-তাবোল কথা বলে হাসি-তামাশা করছিলাম।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শনাবলী ও তাঁর রাসূলকে হাসি-তামাশার পাত্র বানিয়ে নিয়েছিলে? ঈমান আনার পর তোমরা কুফরী করেছ। সুতরাং তোমরা এখন আর কোন অজুহাত দেখিও না’।

৭) ভুলের মাশুল বা খেসারত বর্ণনা করা

নামাজের জামাতে লাইন সোজা করা প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের লাইনগুলো যুক্ত করো, জামাতে কাছাকাছি হও এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও। কেননা যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার কসম, নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের দেখতে পাই তারা কালো ছাগল ছানার ন্যায় লাইনের ফাঁকা জায়গাতে ঢুকে পড়ে।

সুতরাং ভুলের ক্ষতি ও তার পরিণাম কি দাঁড়াতে পারে তা বর্ণনা করা ভুলকারীকে ভুল থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো এই ভুলের পরিণাম ভুলকারীর নিজেকে ভুগতে হয়, আবার কখনো কখনো তা অন্যদেরকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে।

অন্যদের মাঝে ভুলের পরিণাম সংক্রমিত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আরেক ব্যক্তির প্রশংসা করল। লোকটি বলল ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই এই গুণের ক্ষেত্রে আপনার পরে তার মত আর কোন মানুষ নেই।

নবীজী একথা শুনে বললেন, কি সর্বনাশ! তুমি যে তোমার সাথীর গলা কেটে দিলে! কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। তারপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের কাউকে যদি তার কোন ভাইয়ের প্রশংসা করতেই হয় তাহলে সে যেন বলে, আমি অমুকের সম্পর্কে এই এই ধারণা পোষণ করি। আর আল্লাহই তার হিসাব গ্রহণকারী। আমি আল্লাহর নিকটে কাউকে নির্দোষ বলছি না।

অতিমাত্রায় প্রশংসা আনতে পারে ধ্বংস

এই সাহাবীর মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসার পরিণাম কি দাঁড়াতে পারে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে বর্ণনা করেছেন। মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসায় প্রশংসিত ব্যক্তির মন প্রতারণার শিকার হয়। তার মধ্যে মাহাত্ম্য ভাব জন্মে এবং সে নিজেকে দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করে। অনেক সময় প্রশংসার খ্যাতিরে সে আমল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে অথবা প্রশংসার মজা পেয়ে লোক দেখানো আমল করা শুরু করে। এভাবেই সে তার ধ্বংস ডেকে আনে। এ কথাটিই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় ‘তোমরা তাকে ধ্বংস করলে’, ‘তোমরা লোকটার গলা কেটে দিলে’ বা ‘লোকটার পিঠে ছুরিকাঘাত করলে’।

এই হল ভুল সংশোধনের নববী আদর্শ। এখানে মাত্র নবীজীর জীবনের কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হল। এ কয়টির উপরও যদি আমরা আমল করা শুরু করি তবে তার দরূণ অতি সহজেই কারও ভুল সংশোধন করা যাবে এবং এতে সে মনঃকষ্টেরও শিকার হবে না।