নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর হিজরতের শ্বাসরুদ্ধকর গল্প

আকীদাহ ১৬ আগস্ট ২০২০ Contributor
Учёные Ислама: Шамсуддин ар-Рамли

‘হিজরত’ শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে পরিত্যাগ কিংবা পরিবর্জন করা। কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় হিজরত বলতে বুঝায়, দ্বীন ইসলামের খাতিরে নিজের দেশ ছেড়ে এমন স্থানে গমন করা যেখানে গেলে পরিপূর্ণরূপে দ্বীন পালন করা সম্ভব। আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে নজর দিই তাহলে দেখতে পাব যে, মদীনায় হিজরতের মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছিল। সেখানে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই শহরে হিজরত করার কারণেই শহরটির নাম হয়েছে মদিনাতুন্নাবী বা নবীর শহর; বর্তমানে যা মদীনা নামেই পরিচিত।

আসুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের এই হিজরতের ঘটনাটি খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নব্যুয়তের প্রথম দিকে যেসব মুসলমান মক্কায় কাফিরদের হাতে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল, নবীজি তাদেরকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। এটা টের পেয়ে কাফিররা মুসলমানদের ওপর জুলুমের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় এবং তারা যাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে মদীনায় যেতে না পারে, সে জন্যে সব ধরনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুসলমানেরা তাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির জীবন বিপন্ন করেও নিছক দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করাকেই পছন্দ করে। কোনো ভয়-ভীতিই তাদেরকে এই সংকল্প থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এভাবে নবুয়্যতের ত্রয়োদশ বছরের শুরু পর্যন্ত বহু সাহাবী মদীনায় হিজরত করেন।

কুরাইশ কাফিররা যখন দেখতে পেল যে, মুসলমানরা একে একে মদীনায় গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং সেখানে ইসলাম ক্রমশ প্রসার লাভ করছে তখন তারা নবীজীকে হত্যা করে ইসলামকে চিরতরে খতম করে ফেলার পরিকল্পনা করতে লাগল।

এ হঠকারী ও অবিবেচক গোত্রপ্রধানরা ভেবেছিল যে, তাদের এ পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা নবুওয়াতের মিশনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা এ চিন্তা করে নি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামও পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের ন্যায় ঐশী সাহায্যপ্রাপ্ত। যাইহোক, আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে রাসূলকে মুশরিকদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “এবং যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করবে অথবা হত্যা করবে অথবা তোমাকে নির্বাসিত করবে। তারা যেমন ষড়যন্ত্র করে মহান আল্লাহ্ও তেমনি পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করেন এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী।”

এই আয়াত নাজিলের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরতের নির্দেশ পান। তিনি তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী আবু বকর(রাযিঃ) কে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন।

সাওর পর্বতের গুহার ঘটনা

হিজরতের এক পর্যায়ে তাঁরা সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন। এদিকে মুশরিকরা তাদেরকে আটকাতে তাঁদের পেছনে ছুটল। এ ছিলো মানবতার সুদীর্ঘ সফরের সবচেয়ে নিদারুণ ও চরম সন্ধিক্ষণ। এ ছিলো এমন এক দুর্ভাগ্য যার কোনো শেষ ছিলো না কিংবা এমন এক সৌভাগ্যের সূচনা যার কোনো সীমা ছিলো না। মানবতা অস্থিরচিত্তে শ্বাসরুদ্ধ করে এবং নিশ্চল ও নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে সেসব গুপ্তচর ও অনুসরণকারীকে অবাক চোখে দেখছিলো যারা সেই মুহূর্তে গুহার মুখে দাঁড়িয়েছিলো এবং এতটুকু বাকি ছিলো যে, তাদের মধ্যে কেউ নিচের দিকে তাকাবে আর তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে ফেলবে।

কিন্তু আল্লাহর কুদরত তাদের ও তাদের পদক্ষেপের মাঝে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো এবং তারা প্রতারিত হলো। তারা দেখলো গুহার মুখে মাকড়সার জাল ও কবুতরের বাসা। ফলে তাদের ধারণাও আসেনি যে, ভেতরে কেউ থাকতে পারে। এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “এরপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

সেই মুহূর্তে হজরত আবু বকর(রাযিঃ) দৃষ্টি ওপরে উঠতেই মুশরিকদের আসার আভাস পেলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, তারা আর এক কদমও যদি এগোয় তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে। রসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, সেই দুজনের তোমার কি ধারণা যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ? এ সূত্রেই আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেন, যদি তোমরা তাকে (রাসুলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিলো, তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

এভাবেই আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে হেফাজত করলেন।