নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাস্তবমুখী আচরণ

ID 97614251 © Irinabal18 | Dreamstime.com

সারা দিন জুড়ে আমরা কার সাথে থাকি এবং তাদের প্রত্যাশা কী, এর উপর নির্ভর করে আমাদের সকলরেই বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী হয়। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল ধৈর্য্য, কৃতজ্ঞতা বা দয়া। আমরা তাদের সাথেই বাস করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি যারা আমাদের মতই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। এমন কারও সাথে বাস করতে পছন্দ করি যারা আমাদের ত্রুটিগুলি দেখে এবং তা কখনও বাইরের বিশ্বের কাছে প্রদর্শন করে না। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) এর সাথে কথা বলার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক তারা, যারা তাদের পরিবারের মধ্যে সেরা এবং তোমাদের মধ্যে আমি আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে সেরা” (তিরমিযী)।

এর থেকে আমরা যা বুঝতে পারি তার মধ্যে একটি হল মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা তখন সহজ হয়, যখন আপনি সপ্তাহে কয়েক ঘন্টা বা দিনে কয়েক ঘন্টা তাদেরকে আপনার সামনে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করবেন, তাদের খোঁজখবর নিবেন, নতুন কেউ আসলে হাসিমুখে তাদের সাথে পরিচিত হবেন এবং তাদের সাথে সহানুভূতি বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তবে এটি এত সহজ নয়। এর জন্য কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় প্রয়োজন। পরিবারের মধ্যে এরকম ব্যবহার পরিবারের রঙ কেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবারের সাথে ব্যবহারের যে বর্ণনা আমরা তাঁর স্ত্রীদের মাধ্যমে জানতে পারি তা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, তিনি কোনো মুখোশধারী ব্যক্তি ছিলেন না বা কোনো নকল ও ছদ্মবেশীও ছিলেন না। বরং, প্রকৃতপক্ষেই পরিবারের সাথে তাঁর ব্যবহার সবচেয়ে উত্তম ছিল।

এ হিসেবে একটি বর্ণনা উল্লেখ করা যায়। যেদিন ওহী নাযিলের সূচনা হয় সেদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় খাদিজা (রাযিঃ) এর ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি খাদিজা (রাযিঃ) কে অনুরোধ করে তাঁকে একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার জন্য বলেলেন। এরপর হেরা গুহায় তাঁর সাথে কী ঘটেছিল তা খাদিজা (রাযিঃ) কে খুলে বললেন। এরকম আশ্চর্যজনক ঘটনা শোনার পরেও খাদিজা (রাযিঃ) তাঁকে পাগল বলা বা তাঁর কথা শুনে হাসা বা এমনকি তাঁর জন্য দুঃখবোধ করেননি। বরং, তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছার দ্বারা নবীজীর সাথে এরকম আশ্চর্যজনক কিছু ঘটেছিল। কারণ তিনি নবীজীর মহৎ গুণাবলী সম্পর্কে ভালোভাবেই জানতেন। তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করলেন এবং তাঁকে এই আশ্বাস দিচ্ছিলেন যে, আল্লাহ তা’আলা কখনও তাঁকে ছেড়ে যাবেন না। বরং তাঁকে পরিপূর্ণরূপে দেখভাল করবেন। কারণ, হিসেবে তিনি যা উল্লেখ করলেন এটাই সবচেয়ে আকর্ষনীয় বিষয়।

তিনি নবীজীকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন যে, তিনি সর্বদা তাঁর আত্মীয়দের প্রতি সদাচারী ছিলেন, তাঁর কথায় তিনি সর্বদা সত্যবাদী ছিলেন, তিনি অভাবীদেরকে সহায়তা করতেন, দুর্বলদের সমর্থন করতেন, অতিথিদেরকে সামর্থ্যমত আপ্যায়ন করতেন এবং যারা অসুস্থ হত তাদেরকে সেবা-শুশ্রুষা করতেন। নবীজীর এই ক্রিয়াকলাপের বিবরণটি যদি পরিবারের অন্য কোনো সদস্য থেকে বা এমনকি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আসত, তবে সেটি আলাদা কথা ছিল। কিন্তু এই বিবরণটি তাঁর স্ত্রীর মুখ থেকে এসেছে, যে সারাটা জীবন তাঁর স্বামীকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। তাই এটির চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো বিবরণ হতে পারে না। তাঁর স্ত্রী, এমন একজন মহিলা যিনি তাকে তাঁর জীবনের বিভিন্ন মুহুর্তে কাছ থেকে দেখেছেন, যিনি তাঁকে দিনরাত বিভিন্ন অবস্থায় দেখেছেন, যিনি প্রহরীর মত তাঁর সাথে ছিলেন। আসলেই তিনি কেমন মানুষ তা তিনি ভাল করেই জানতেন। এরকম জানাশোনার পর তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে এই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে, তিনি একজন সম্মানিত মানুষ এবং এমন একজন মানুষ যিনি কাউকে হতাশ করেন না।

এ কারণেই মানুষ বলে থাকে যে, যদি আপনি সত্যই কোনো পুরুষ সম্পর্কে জানতে চান, তবে তার স্ত্রীর কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন যে, তিনি পরিবারের সাথে কেমন সময় কাটান। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম- জনসাধারণের জন্য যেমন কোমল হৃদয় ছিলেন তেমনি ছিলেন বন্ধ দরজার পিছনে তাঁর পরিবারের জন্য। কারও সাথে আচরণে তিনি দ্বি-মুখী ছিলেন না বা বিভিন্ন মুখোশ পড়ে তিনি কখনও নিজের রঙও পরিবর্তন করতেন না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সব জায়গাতেই বাস্তবমুখী ছিলেন, কোনো লোক দেখানো বা ভণিতা তাঁর মধ্যে ছিল না।