নাগরনো-কারাবাখ- ভৌগলিক রাজনীতির এক ধোঁয়াটে অঞ্চল

Nagorno-Karabakh, Armenia/Azerbaijan - October 22, 2017: `We Are Our Mountains` also know as `tatik-papik` տատիկ-պապիկ in Armenian, which translates as `Grandmother and Grandfather` located north of Stepanakert
Nagorno-Karabakh, Armenia/Azerbaijan - October 22, 2017: `We Are Our Mountains` also know as `tatik-papik` տատիկ-պապիկ in Armenian, which translates as `Grandmother and Grandfather` located north of Stepanakert. Photo 198217915 © - Dreamstime.com

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দীর্ঘকালীন সংঘর্ষের মধ্যে অন্যতম হলো নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের যুদ্ধ। যদিও বর্তমানে একটি শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। শান্তিচুক্তি অনুসারে পয়লা ডিসেম্বরের মধ্যে আরমেনিয়া তার বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যাবে এবং ১৯২০ সালে রাশিয়ার করা চুক্তি অনুসারে নাগরনো-কারাবাখ আজারবাইজানের অধিকারেই থাকবে।

ভৌগলিক অবস্থানঃ

ককেশাস পার্বত্য অঞ্চলের অবস্থান ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে, এর উত্তরে রাশিয়া অবস্থিত, দক্ষিণে ইরান ও তুরস্ক, পূর্বে ও পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর।

উত্তর ও দক্ষিণে দুইভাগে ভাগ করা যায় এই অঞ্চলকে। দক্ষিণ ককেশাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হল আরমেনিয়া, জর্জিয়া ও আজারবাইজান।

দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর ইতিহাস ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুরু হয় সোভিয়েত যুগের শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। সেই কারণেই আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত ধোঁয়াটে। আরমেনিয়ার ৯৭ শতাংশ অধিবাসী খ্রিস্টান ধর্মমতে বিশ্বাসী, অন্যদিকে আজারবাইজান সম্পূর্ণ রূপে ইসলাম অধ্যুষিত অঞ্চল।

প্রাকৃতিক ও আঞ্চলিক সাদৃশ্য কিন্তু জীবনযাপন ও ধর্মমতের অমিল থাকায় এই দুটি দেশের মধ্যে বরাবর জাতিগত অস্থিরতা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত দ্বন্দ্ব নাগরনো-কারাবাখ। উদ্দিষ্ট অঞ্চলের দখল নিয়ে পরায় তিন দশক ধরে যুদ্ধ চলছে নব্বইয়ের দশকে স্বাধীনতা পাওয়া এই দুই দেশ, সেই ১৯৮৮ সাল থেকে।

ককেশাস পার্বত্যঞ্চলের এই উচ্চভূমির জনসংখ্যা বর্তমানে ৪১০০০ জন। ১৯৮৯ সালে এই জনসংখ্যায় ৭৬ শতাংশ ছিল আর্মেনিয়ান ও ২২ শতাংশ্ত আজারবাইজানের মানুষ, কিন্তু আরমেনিয়ার তরফ থেকে ক্রমাগত আক্রমণ ও আজারবাইজানের মুসলমানদের প্রতি বৈরিতার দরুণ বর্তমানে জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ আরমেনিয়ার মানুষে এসে ঠেকেছে। এখন আরমেনিয়ার দাবী, যেহেতু জনসংখ্যার বেশিরভাগ আরমেনিয়ার মানুষ তাই এই অঞ্চলটি তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হোক।

এদিকে ইতিহাসের পাতা উল্টোলে দেখা যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় আজারবাইজানের হাতেই এই অঞ্চলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।

Artsakh_Occupation_Map

ইতিহাসঃ

১৯২০ সালে জোসেফ স্তালিন তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন দক্ষিণ ককেশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলকে। যদিও নাগরনো-কারাবাখের বেশির ভাগ মানুষ আর্মেনীয় ছিলেন তাও স্তালিনের এই সিদ্ধান্তের কোনও প্রতিবাদ করা হয়নি।

কিন্তু ১৯৮৭ সালে সোভিয়েতের পতনের পর এই অঞ্চলের মানুষ একটি গণভোটের আয়োজন করে। সেই গণভোটে কিছু মানুষ আরমেনিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হতে চায়, কিছু মানুষ নাগরনো-কারাবাখকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকার করতে চায় আর কিছু মানুষ আজারবাইজানের সংগে যুক্ত থাকতে চায়। এর ফলেই এই অঞ্চলের দখল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় ও তা ছয় বছর ধরে চলে ( ১৯৮৭-১৯৯৪)।

এই যুদ্ধে নাগরনো দখল করে আরমেনিয়া, আজারবাইজান প্রাণপণে বাধা দেয়। ফলে, এক অদ্ভুত ‘স্টেলমেট’ বা আচলবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল।

এখনও পর্যন্ত ম্যাপে এই অঞ্চলটি আজারবাইজানের অন্তর্গত , তবে আরমেনিয়ার মানুষ মনে করেন নাগরনো কারাবাখ তাঁদের, তাই তারা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছেন ‘আরতসাখ রিপাবলিক’।

দুই দেশের মধ্যে রাজনীতিঃ

আজারবাইজানের শাসক ইলহাম পরিবারের শাসন ব্যবস্থা মূলত কমিউনিস্ট ধাঁচের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। ইলহামের রাজনৈতিক দল নিউ আজারবাইজান পার্টি  সবসময়ই নাগরনো-কারাবাখকে নিজেদের রাজনৈতিক বিষয় বলে ভেবে এসেছে।

অপরাপর আরমেনিয়ায় গণতন্ত্র রয়েছে, সঙ্গে রয়েছে দূর্নীতি। তবে, প্রধানমন্ত্রীর আসন বজায় রাখার জন্য নাগরনো-কারাবাখের দখল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আপাত দৃষ্টিতে দুই দেশের বিরোধকে ধর্মীয় বিরোধ, অর্থাৎ খ্রিস্টান ও সিয়া ইসলাম ধর্মের বিরোধ বলে মনে হলেও ধর্মীয় বিরোধের থেকে আঞ্চলিক বিরোধ বহুলাংশে গুরুত্ব পেয়েছে।

এর কতগুলি কারণ রয়েছে,

প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জোসেফ স্তালিনের হাতে সৃষ্ট বলে, আজারবাইজান সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে। ফলে দেশের জনসাধারণ ইসলাম সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৩০ শতাংশ আজারবাইজানি মানুষের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে ও ২২ শতাংশ নিয়মিত নমাজ আদায় করেন।

দ্বিতীয়ত,

অন্যান্য ইসলাম ধর্মের দেশের মতো এই অঞ্চলের শিয়া সুন্নি নিয়ে দ্বন্দ্ব নেই, আজারবাইজানের মানুষের মধ্যে তূর্কী শিয়া ও ইরানি সুন্নি দুই ধরনের মানুষই রয়েছে।

ফলে বলা যায়, নাগরনো-কারাবাখ নিয়ে দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই।

২০১৮ সালে আরমেনিয়া এক শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক সার্গিসনকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। বিপ্লবের নেতা নিকোল পাশিনিয়ান অতঃপর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কার্যা সম্পাদনা করছেন। ২০১৯ এ আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয় যে নাগরনো কারাবাখের মানুষদের জন্য মিলিটারি হটলাইনের ব্যবস্থা হবে ও আস্তে আস্তে অঞ্চলটিতে শান্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।

কিন্তু ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হুয়েছিল তার দায় কোন দেশের তা এখনও ইউ এনের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে, শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার হস্তক্ষেপে আবার শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। যুদ্ধের সময় যে যে অঞ্চল আজারবাইজান দখল করেছে সেগুলো আজারবাইজানের অধীন বলে মেনে নিয়েছে আরমেনিয়া, অপরদিকে নিজের বাহিনীকে আস্তে-আস্তে সরিয়ে নেওয়ার কথাতেও সদর্থক উত্তর দিয়েছেন আরমেনিয়ার প্রাধানমন্ত্রী।