নাভিতে তেলের মালিশ: বিজ্ঞান না অপবিজ্ঞান?

স্বাস্থ্য ০৬ জানু. ২০২১ Contributor
ফোকাস
নাভিতে তেল
© Rido | Dreamstime.com

ইসলাম ধর্মের অন্যতম মূল উপজীব্য- কুরআন ও সুন্নাহ থেকে জীবনের সমস্ত ঘটনার সপক্ষে প্রমাণ গ্রহণ করা।

আমাদের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে আমরা কুরআনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া আমাদের মহান নবী রাসুল (সাঃ)-এর জীবন থেকে আহরিত শিক্ষাও চলার পথে আমাদের সহায়তা করে। আমাদের পবিত্র ধর্মের ইতিহাস এতটাই সমৃদ্ধশালী যে বর্তমান যুগের সিউডোসায়েন্স বা অপবিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস না করলেও চলে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,

‘আর আমি তোমার পূর্বে কেবল পুরুষদেরকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠিয়েছি। সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো।’ [অধ্যায় ১৬, স্তবক ৪৩]

কোনটা অপবিজ্ঞান?

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমরা হয়তো হোমিওপ্যাথির চিকিৎসাকে একেবারে নস্যাৎ করে দিই না। কারণ একথা সত্যি কোনও কোনও ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথির কিছু ওষুধ মানুষের উপকারে লাগে। কিন্তু হোমিওপ্যাথির উপর অন্ধ বিশ্বাস রেখে জীবনের সব ক্ষেত্রে সেটিকে প্রয়োগ আমরা করব না।

মেডিকেল সায়েন্স ও মানুষের শরীর সংক্রান্ত গবেষণা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। অনেকসময় সঠিক তথ্য না পেলে আমাদের মধ্যে নানা প্রকার ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। যেমন, হোমিওপ্যাথিতে ক্যান্সার সারে। এটি একেবারেই ঠিক কথা নয়। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড মেডিকাল রিসার্চ কাউন্সিল প্রায় ২২৫ টি গবেষণা পেপার প্রকাশ করেছে। প্রত্যেকটি পেপারের উপসংহারে জানা গিয়েছে যে হোমিওপ্যাথি আদতেই মানুষের জটিল অসুখ সারানোতে সেভাবে কোনও উপকারে আসে না।

আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির মতে, হয়তো কিছু অসুখ সারাতে আয়ুর্বেদিক একটা দুটো ওষুধ উপকারী। প্রাচীন কালে, যখন অ্যালোপ্যাথি ছিল না, তখন মানুষ আয়ুর্বেদিক ওষুধের উপরই নির্ভর করত। কিন্তু এখানেও গবেষকরা জোরালো কোনও প্রমাণ পাননি।

সুতরাং, বলা চলে, যে সমস্ত বিষয়ের কোনও জোরালো প্রমাণ গবেষকদের হাতে নেই। সেই সমস্ত বিষয়কে বিজ্ঞান হিসাবে মেনে নেওয়া কঠিন। অতএব, অপবিজ্ঞান বা সিউডোসায়েন্সের সূচনা এখান থেকেই হয়।

এরকমই একটি অপবিজ্ঞান বা ভুল ধারণা হল নাভিতে তৈল প্রদানের অভ্যাস।

নাভিতে তেল মাখার উপকারিতা

অনেকেই মনে করেন, নিয়মিত নাভিতে তেল না মালিশ করলে শরীরের শিরা উপশিরা ধমনী শুকিয়ে যেতে শুরু করবে।

এটা সর্বৈব ভুল মতবাদ। আগে বুঝতে হবে শিরা ও ধমনী কাকে বলে।

আমাদের শরীরে হৃৎপিণ্ড থেকে অন্যান্য অঙ্গে রক্ত বহন করে নিয়ে যায় ধমনী, এবং সেখান থেকে রক্তকে হৃদয়ে আবার ফেরত নিয়ে আসে শিরা। হ্যাঁ, কোলেস্টেরল বেশি হলে ধমনীতে চর্বি জমে ধমনী সরু হয়ে যেতে পারে। কিংবা শিরাগাত্র পাতল হয়ে যেতে পারে কোনও অসুখের ফলে। কিন্তু এগুলি কখনওই শুকিয়ে যাবে না, কারণ, আমাদের দেহ থেকে রক্ত কখনও শুকিয়ে যেতে পারে না।

তাই নাভিতে তেল দিলে আপনার নাভির চারপাশের ত্বক হয়তো কোমল হয়ে উঠবে। কিন্তু শিরা ধমনীতে সেই তেল পৌঁছবে না।

বৈজ্ঞানিকদের দাবি

ত্বকে তেল মালিশ করলে সেই তেল শরীরের অভ্যন্তরে পৌঁছয় না। প্রকৃতি ও আল্লাহ আমাদের শরীরকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যাতে আমাদের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ সঠিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে।

বায়োলজিস্ট লোরেন ডালমেয়ার বলেন, শরীরের ত্বকে তেল মালিশ করলে সেই তেল হয়তো খুব বেশি হলে আমাদের অন্তঃত্বকে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু তারপর মাংসপেশি ও দেহের অভ্যন্তরে সেটির প্রবেশ করার কোনও কারণ নেই। এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে অবৈজ্ঞানিক।

নাভিমূল নিয়ে আরও নানাপ্রকার ভুল ধারণা রয়েছে আমাদের মধ্যে। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু গর্ভে থাকার সময় মা ও সন্তান, মূলত প্ল্যাসেন্টা ও ফিটাসের মধ্যে সংযোগ সাধন করে আম্বিলিকাল কর্ড। তাই জন্মের পরেও আমাদের নাভির বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। এতে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ভাল হবে।

ডঃ রবার্ট মিঙ্কেস, গোলিসানো চিল্ড্রেন্স হসপিটালের ডিরেক্টর এই ধারণা একেবারে খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, একমাত্র গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের বিকাশে আম্বিলিকাল কর্ডের প্রয়োজনীয়তা থাকে। শিশুর জন্মের পর এর কোণও ভূমিকা নেই।

সুতরাং বলা চলে, বিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে চলে। আর মহান আল্লাহর ইচ্ছা, আমরা যেন কখনওই অপবিজ্ঞানের ফাঁদে পা না দিইই। তিনি আমাদের মঙ্গল করার জন্য সদাই উন্মুখ। আমিন।