SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

নিউ নর্ম্যালে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে নিয়মিত সালাতের অভ্যাস

সালাত ০৪ জানু. ২০২১
মতামত
সালাতের
© Elmirex2009 | Dreamstime.com

কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের জীবনে নতুন একটি শব্দের জন্ম দিয়েছে, ‘নিউ নর্ম্যাল’। ২০২০ এর আগে পর্যন্ত যেভাবে আমাদের জীবন চলত। যে সহজ স্বচ্ছন্দ ভাবে আমরা সব কাজ করতাম তার অনেকখানিই পালটে গিয়েছে এতদিনে। এসেছে অসহায়ত্ব, দুশ্চিন্তা। তবে, আল্লাহ তালার কৃপা যে এই সমস্ত কিছুর মধ্যে মন ও চিন্তা স্থির রাখার একটি উপায় তিনি আমাদের জন্য ধার্য্য করেছেন- সেটি হল নিয়মিত সালাত।

সালাতের মাধ্যমেই আমরা আমাদের অসহায়ত্ব দুশ্চিন্তা থেকে আস্তে আস্তে আশার আলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারব। নিউ নর্ম্যাল হয়ে উঠবে সুমধুর ও সন্তোষজনক।

সালাত আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। আমাদের ধর্মের সারবত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সালাতের প্রতি বিশ্বাস। সালাত শুধুমাত্র আল্লাহ তালাকে স্মরণ করার পদ্ধতি নয়, আমাদের সম্পুর্ণ মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক উন্নতি জড়িয়ে রয়েছে নিয়মিত নমাজ আদায় করার মধ্যে।

এই প্রতিবেদনে রইল সালাত আদায় করার কী কী সদর্থক প্রভাব রয়েছে আমাদের জীবনে তার একটি সহজ বিবরণ।

কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সালাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে

আমাদের শরীর ও মনের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাপ নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এর থেকে বেশি হলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যালোস্ট্যাটিক লোড’। সাধারণত প্রতিদিনের কাজে যে পরিমাণ চাপের সম্মুখীন আমরা হই তা সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও বিশ্রামের মাধ্যমে সামলানো যায়। কিন্তু দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও যুদ্ধকালীন সময় আমাদের উপর অনেক বেশি চাপ পড়ে। তখনই আস্তে আস্তে আমরা ডিলিউশনাল ও ডিজওরিয়েন্টেড হতে থাকি। সেই সময়েই আমাদের শক্তি দেয় নিয়মিত সালাতের অভ্যাস।

আল্লাহ সুভানাহু ওয়া তালা আমাদের এই বিপদের মুহূর্তে শক্ত থাকার জন্য দুটি অস্ত্র দিয়েছেন,

সালাত ও সবর। কুরআনে ইরশাদ রয়েছে,

‘হে মু’মিনগণ! ধৈর্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ [ কুরআন অধ্যায় ২, স্তবক ১৫৩]

সবর অর্থাৎ ধৈর্য্য আমাদের প্রতি আল্লাহর চরম কৃপার একটি নিদর্শন। কিন্তু ধৈর্য্যশীল হতে গেলে আমাদের ব্যক্তিগত কিছু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ধৈর্য্য আসলে অভ্যাসের ব্যাপার। আর তার জন্য আমাদের সালাতেরই দ্বারস্থ হতে হবে।

সালাত আমাদের পরম আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে। এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের মধ্যে সদর্থক ও সৎ শক্তির চালনা করেন। আল্লাহর রহমত আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকে, ফলে আস্তে আস্তে আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। জীবনের সব অস্থিরতা ও সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার শক্তি পাই।

এই জন্যই আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ)কে মহান আল্লাহ প্রতিদিন রাতে উপাসনা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে ইসলামকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাসুল(সাঃ) প্রবল কর্মক্ষমতার প্রয়োজন ছিল। একমাত্র সালাতই সক্ষম হয়েছিল সেই শক্তি তাকে দিতে।

‘হে বস্ত্রাবৃত! রাতে সালাতে দাঁড়াও কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম। অথবা তদপেক্ষা বেশী। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে। আমি তোমার উপর গুরুভার কালাম নাযিল করব (বিশ্বের বুকে যার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্বভার অতি বড় কঠিন কাজ)।’ [কুরআন অধ্যায় ৭৩, স্তবক ১-৫]

সালাত আমাদের জীবনের গঠনগত দিক সম্পর্কে নির্দেশ দেয়

আমরা সবাই অভ্যাস অনুসারে চলি। অভ্যাস আমাদের মানসিক দৃঢ়তা দেয়। এই মহামারীতে আমাদের এই অভ্যস্থ জগত পুরো উলটে পালটে গিয়েছে। রোজ যার অফিস যাওয়ার অভ্যাস ছিল, এখন দিন শুরু হয় বিছানায় বসে ল্যাপটপে লগ ইন করে। এর ফলে আমাদের মানসিক সন্তুলনের সমস্যা হচ্ছে অনেকেরই। উদ্বেগ বাড়ছে। এই সময়েই সালাত আমাদের মানসিক শক্তির যোগান দিতে পারে।

মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,

‘মানুষতো সৃষ্টি হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্ত রূপে। বিপদ তাকে স্পর্শ করলে সে হয় উৎকণ্ঠিত, আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে তখন সে হয় অতি কৃপণ। তবে সালাত আদায়কারী ব্যতীত। যারা তাদের সালাতে সদা নিষ্ঠাবান।’ [কুরআন অধ্যায় ৭০, স্তবক ১৯-২৩]

উদ্ধৃত বাণীটি খুব সহজেই আমাদের বর্তমান মহামারীর অবস্থা বুঝিয়ে দেয়। মানুষ বিপদে পড়লে অত্যন্ত স্বার্থপর হয়ে ওঠে। কিন্তু নিয়মিত সালাত আদায় করা ব্যক্তিরা এর মধ্যেও মানসিক ভাবে সবল থেকে নিজেদের ইমান ও জিম্মা রক্ষা করতে পারে।

সালাত একজন সহিহ মুসলমানকে তার জীবনবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে

সালাত আমাদের বর্তমান অবস্থাকে চিনতে শেখায়

আধুনিকতা আমাদের মানসিকতা ও জীবনবোধকে কীভাবে পালটে দিচ্ছিল তা এই একবছরের মহামারী তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন অন্তরের থেকে বাইরের চাকচিক্যকে বেশি প্রাধান্য দিই। আত্মসমালোচনা, আত্মঅন্বেষণ এখন অতীত! ভাবনা চিন্তা করা এখন আউট অফ ফ্যাশন। আর এখানেই সালাত আমাদের সাহায্য করে বর্তমানের আসল অবস্থাটা বুঝে নিজেদের সামলে নিতে। নিয়মিত নমাজ আদায় আমাদের চিন্তাশক্তিতে যুক্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ রাখে। এর ফলে আমরা চট করে যেকোনো স্রোতে পা দিই না।

হাদিসে এর একটি বিবরণ রয়েছে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ বলেছেনঃ আমার এবং আমার বান্দার মাঝে আমি সলাত কে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিয়েছি এবং আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়। বান্দা যখন বলে, (আরবী) (সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য), আল্লাহ তা’আলা তখন বলেনঃ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। সে যখন বলে, (আরবি) (তিনি অতিশয় দয়ালু এবং করুণাময়); আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ বান্দা আমার প্রশংসা করেছে, গুণগান করেছে। সে যখন বলে, (আরবি) (তিনি বিচার দিনের মালিক); তখন আল্লাহ বলেনঃ আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে। আল্লাহ আরো বলেনঃ বান্দা তার সমস্ত কাজ আমার উপর সমর্পন করেছে। সে যখন বলে, (আরবি) (আমরা কেবল তোমারই ‘ইবাদাত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি); তখন আল্লাহ বলেনঃ এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার।

সালাতের ফলে আমাদের সহ্যক্ষমতা ও প্রাণোচ্ছলতা বর্ধিত হয়

মহামারীতে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন? কিংবা কর্মক্ষেত্র থেকে ছাঁটাই হয়েছেন? অত্যন্ত উদ্বেগ ও মনখারাপের মধ্যে দিন কাটছে? সালাত কিন্তু আপনার সহ্যক্ষমতা বাড়িতে দিতে পারে। ফিরিয়ে দিতে পারে অল্প হলেও একটু শান্তিপূর্ণ প্রাণোচ্ছল ভাব।

আপনি যখন জায়নমাজের উপর বসে সালাতের প্রথম পাঠ পড়বেন, তখন থেকেই লক্ষ্য করবেন আপনার মনের অন্ধকার একটু একটু করে কাটতে লেগেছে।

‘আল্লাহরই জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি বিশ্বজগতের রাব্ব।’ [কুরআন অধ্যায় ১, স্তবক ২]

এটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মন শান্তিতে পূর্ণ হয়ে যাবে। আপনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। আর কৃতজ্ঞতা সেই মানুষই জানাতে পারে যে নিজের মনের সঙ্গে লড়াই জিতে গিয়েছে। যে মুহূর্তে আপনি এটা বুঝবেন, সেই মুহূর্তেই দেখবেন আপনি আস্তে আস্তে শান্ত হতে পারছেন। আল্লাহর উপর ভরসা ও কৃতজ্ঞতা আস্তে আস্তে আপনার নিজের উপরও আসবে।

কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,

‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যাদের উপর কোন বিপদ নিপতিত হলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ [কুরআন অধ্যায় ২, স্তবক ১৫৫-১৫৭]

আল্লাহর পরীক্ষায় আমরা যদি কৃতকার্য হই, তাহলেই নিজেদের সহিহ মুসলমান বলে স্বীকার করতে পারব।

আমাদের সাফল্যের শিখরে যেতে সাহায্য করে সালাত

ধরে নিন আপনি একটি নতুন কোম্পানিতে জয়েন করেছেন। প্রথম দিনই যদি সিইও আপনাকে অত্যন্ত প্রশংসা করে তাহলে আপনার কাজ করার ইচ্ছে বাড়বে বই কমবে না। ঠিক এইভাবেই, মহান আল্লাহ জীবনের ক্ষেত্রে বলেছেন,

অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু’মিনগণ- যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত। [ কুরআন অধ্যায় ২৩ স্তবক ১-২]

মনে রাখবেন সাফল্য মানেই সবসময় বড় আকারের কিছু তা নয়। আপনি এই মহামারীতে আপনার পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পেরেছেন, আপনি একজন সফল মানুষ। এই মহামারীতে আপনি নিজের মানসিক অবস্থা সামলে রাখতে পেরেছেন, আপনি একজন সফল মানুষ। আল্লাহ ছোট ছোট সাফল্যকেও প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন।

আমাদের সালাতের আযানে বলা হয়, ‘উপাসনায় এসে, সাফল্যের পথে এস।’

সালাতের মাধ্যমেই জীবনের সব ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়ে উঠব। ভাল মানুষ হিসাবে, সহি মুসলমান হিসাবে ও কর্মক্ষেত্রে সফল চাকুরীজীবী হয়ে।