নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী

আকীদাহ ২৫ মার্চ ২০২১ Contributor
randy-jacob-A1HC8M5DCQc-unsplash
Photo by Randy Jacob on Unsplash

মানুষের জন্য কষ্টদায়ক হয় এমন কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য ইসলাম বারবার নির্দেশ দিয়েছে। কাউকে সামান্য কষ্ট দেওয়া তো দূরের কথা, ইসলাম চরম শত্রুর সাথেও বাস্তবতার বিচারে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের উৎসাহ দিয়েছে। ইসলামে যেখানে মানুষকে কষ্ট দেওয়াই নিষেধ, সেখানে অন্যের ক্ষতি করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ; ভয়াবহ পাপের কারণ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করা কোনোটিই ইসলামে অনুমোদিত নয়।” (ইবনে মাজাহ)

নিজের বা অন্যের ক্ষতি প্রতিহত করা ইসলামের মূলনীতি

আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনদের সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সে নিজেকে যেমন সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, তেমনি অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কাজ করা থেকেও বিরত থাকবে। সুতরাং, এই কথা সুস্পষ্ট যে শারীরিক, আর্থিক, পার্থিব ও পরকালীন সকল ধরনের ক্ষতিই এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতি দূর করা। এর ভিত্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী ‘অনুমোদিত নয় নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং অন্যকেও।’ কেননা ইসলামী শরীয়তের ভিত্তিই স্থাপিত হয়েছে ‘কল্যাণ লাভ’ ও ‘ক্ষতি প্রতিহত’ করার উপর। এই নীতির অন্তর্ভুক্ত বিধান হলো ক্ষতির যেকোনো ধরণের সম্ভাবনা দূর করা এবং ক্ষতি অপরিহার্য হলে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিষয়টি বেছে নেওয়া।

উল্লিখিত হাদিসের আলোকে মুহাদ্দিস বা হাদিস বিশারদগণ কয়েকটি শাখাগত বিধান বর্ণনা করেছেন। সেগুলি হল-

১) হারাম ও ক্ষতিকর এমন কাজে লিপ্ত হয়ে নিজেকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হারাম।

২) অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ।

৩) জীবন, সম্পদ, পরিবার ও সম্ভ্রম সকল ধরনের ক্ষতিকর বিষয় পরিহারযোগ্য।

৪) ইসলামী শরীয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ক্ষতি হওয়ার আগে তা প্রতিহত করা এবং ক্ষতি হয়ে গেলে তা দূর করা বা প্রতিকার করা।

৫) ইসলামী শরীয়তের সাধারণ বিধান হলো ক্ষতিকর যেকোনো বিষয় নিষিদ্ধ।

ইবাদতের ক্ষেত্রে ক্ষতি প্রতিহত করার দৃষ্টান্ত

ইসলামী আইন ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত বইগুলোয় মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে ইসলামের মৌলিক বিধানেও ‘রুখসত’ বা অবকাশ দেওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অযুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করা, দাঁড়ানোর পরিবর্তে বসে সালাত আদায় করা, মুসাফিরের জন্য ফরজ রোজা কাযা করার অবকাশ থাকা, রাস্তায় নিরাপত্তার অভাবে হজ্জ্ব বিলম্বিত করার অবকাশ থাকা ইত্যাদি।

নিজের বা অন্যের ক্ষতির ভয় থাকলে বৈধ বিষয়ও পরিহারযোগ্য

যদি কোনো কাজ ইসলামে বৈধ হওয়া সত্ত্বেও অন্যের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তবে তা পরিহারযোগ্য। পবিত্র কুরআন থেকে এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে।

বৈবাহিক সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করা সম্পর্কে ইসলামী শরীয়ত অনেক উৎসাহ দিয়েছে। কিন্তু তা যদি অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা দীর্ঘায়িত করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “কিন্তু তাদের ক্ষতি করে সীমা লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না।” (আল কুরআন-২: ২৩১)

ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী শিশু সন্তানরা মায়ের বুকের দুধ ব্যতীত অন্য খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মা চাইলে সন্তানকে পিতার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাতে যদি পিতা বা সন্তানের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে এরূপ করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “কোনো পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না এবং উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ কর্তব্য।” (আল কুরআন-২: ২৩৩)

নিজের এবং অন্যের ক্ষতি কোরো না

ইসলামী শরীয়ত নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছে। যেমনটি আলোচ্য হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (আল কুরআন-২: ১৯৫)

অর্থাৎ, ইসলামী শরীয়তে যেকোনো ধরণের ক্ষতি নিষিদ্ধ। সুতরাং, কোনো মুসলমানের জন্য কথা, কাজ বা অন্য কোনোভাবে অপর কোনো মুসলিমকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কখনই বৈধ নয়। তাতে সে লাভবান হোক বা না হোক। এটি সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এমনিভাবে বৈধ নয় মুসলমানের পথে বা বাজারে এমন কিছু রাখা বা করা, যাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন চলাচলের রাস্তায় ডাল পুঁতে দেওয়া বা কূপ কনন করা ইত্যাদি।

যারা অন্যদের ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয় হাদিসে তাদেরকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে। আবু বকর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ক্ষতিসাধন করবে বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে সে অভিশপ্ত।” (তিরমিযী)

সুতরাং, সকল মুমিনের উচিত নিজেকে এবং অন্যকে সর্বপ্রকার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।