নিজের স্বভাবের দিকে নজর দিন, আপনার সন্তান কিন্তু সবসময় দিচ্ছে

 66994843 © Studio Grand Web | Dreamstime.com
66994843 © Studio Grand Web | Dreamstime.com

কথায় বলে, ‘যা বলছি তা মেনে চলো।‘ মজার ব্যাপার হল, শিশুদের ক্ষেত্রে এই কথা কিন্তু খাটে না। শিশুরা শুনে শেখার আগে দেখে শেখে। মূলত বাবা-মায়ের ব্যবহার নিরীক্ষণ করে বড় হয়ে ওঠে তারা। এছাড়াও আশপাশের অন্যান্য মানুষ, কখনও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে তাদের শেখার মাধ্যম।
আপনি যদি হাতে সিগারেট নিয়ে আপনার দশম বর্ষীয় ছেলেকে ধূমপানের অপকারিতা বোঝাতে যান তাহলে কখনোই তা কার্যকরী হবে না। আগে আপনাকে ধূমপান ত্যাগ করতে হবে অর্থাৎ, আপনি আচরি ধর্ম পররে শেখাও।
বাচ্চাদের এই লার্নিং প্রসেসকে ‘অবজার্ভেশনাল লার্নিং’ বলা হয়। কখনও-কখনও দেখা যায় বাচ্চারা অশালীন কিছু শব্দ শিখেছে। অর্থাৎ, তার দৈনিক অভ্যাসের মধ্যে এমন কেউ রয়েছেন যিনি অশালীন ভাষা প্রয়োগ করেন। বাচ্চা ঠিক সেটা দেখেই শিখেছে।
একই কারণে বলা যায়, পাঁচখানা ইসলামিক স্কুল পাল্টেও যদি কোনও শিশু কোরআন পড়তে সক্ষম না হয় তাহলে অবশ্যম্ভাবি বলা যায় যে তার বাড়িতে কোরআন পড়ার প্রচলন নেই। বাড়িতে সে কাউকে কোরআন পড়তে দেখছে না, তাই তার আগ্রহ তৈরি নেই। প্রকারান্তরে, যে গৃহে নিয়মিত কোরআন পড়ার প্রচলন রয়েছে , সেই বাড়ির বাচ্চা অত অল্প বয়স থেকে কোরআন পড়তে শিখে যায়।
একটা ব্যাপার মাথায় রাখা প্রয়োজন, বাচ্চারা নিয়মিত অভ্যাস দেখে শেখে। প্রতিবেশীর সন্তান যদি একদিন এসে কোনও খেলনা ভেঙে দিয়ে যায়, তাহলেও  তার উপর

 

প্রভাব একেবারেই পড়বে না। কিন্তু আপনি রেগে গেলেই জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দেন, এটা নিয়মিত দেখতে-দেখতেই সে শিখবে। বাবা-মায়ের অভ্যাসকেই সে ধ্রুব বলে মানবে, কারণ তার সামনে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তাঁরাই।
বাচ্চাদের এই অনুকরণের পিছনে অনেকগুলো মনস্ত্বাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। তারা মূলত তাদের ব্যবহারের কদর চায়। তাই, কোনও বাচ্চা যদি দেখে যে অন্য একজনের অশালীন শব্দ ব্যবহারে বাকিরা হাসছে তার মনে হয় এভাবেই কদর ও মনোযোগ পাওয়া যাবে। সেও তাই অশালীন শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে। বরং, যদি সে দেখে অশালীন শব্দ ব্যবহার করলেই প্রচণ্ড ধমক খেতে হচ্ছে তাহলে সে আস্তে-আস্তে অভ্যাস থেকে বিরত থাকে।
শিশুদের এই ‘অবজার্ভেশন’কে কাজে লাগিয়ে তাদের ভাল মানুষ ও ইমানদার মুসলমান করে তোলা খুবই সহজ। আপনি যদি আপনার সন্তানের সামনে মানুষকে সাহায্য, শেয়ারিং, যুক্তিপূর্ণ ব্যবহার করেন, সেও আস্তে-আস্তে তাই শিখতে শুরু করে। বাবা-মাকে যদি রোজ সকালে ফজরের নমাজ পড়তে দেখে, সেও একদিন জায়নমাজ নিয়ে বাবা-মায়ের পাশে বসে প্রার্থনা শুরু করবে।
আপনি অজান্তেই হয়ে ওঠেন আপনার সন্তানের রোল মডেল।
নিম্নলিখিত অভ্যাসগুলির মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানকে ভাল অভ্যাসের প্রতি মনোযোগী করে তুলতে পারবেনঃ

  • সন্তানের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে খেয়াল রাখুন, চেষ্টা করুন তাদের চারপাশে সদর্থক ব্যবহার করার। স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য বন্ধ দরজার আড়ালে হলেই ভাল।
  • সন্তানের মধ্যে কোনও সৎ ও সদর্থক অভ্যাস দেখলে প্রশংসা করুন।
  • হিংস্রতা, হিংসা, কুৎসা থেকে সন্তানকে দূরে রাখুন। আল্লাহের দয়ার কথা তাকে শোনান।
  • কথা বলুন, সন্তানের ব্যবহার যদি চিন্তার বিষয়ে হয়ে দাঁড়ায়। খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন তার কোথায় তার সমস্যা হচ্ছে।

সহজভাবে বলতে গেলে সন্তান সহ আপনার সামনের সব মানুষই আপনার আয়না। আপনি যা ব্যবহার করবেন, সামনের মানুষের মধ্যে ঠিক তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। আল্লাহের কাছে নিয়মিত প্রার্থনার মাধ্যমে যে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়, তা আমাদের সদর্থক ব্যবহারের পাথেয়।
স্বয়ং হজরত মহম্মদ (সাঃ)-কে হযরত আয়েষা (রাঃ) যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সমস্ত অপরাধ ক্ষমা হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি আল্লাহর কাছে কেন প্রার্থনা করছেন? মহানবী (সাঃ)  উত্তর দিয়েছিলেন, ‘অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কি আমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ নয়?’
আল্লাহের পথেই আসে শান্তি আর কৃতজ্ঞতা, আর তার হাত ধরেই আসে সদর্থক ব্যবহার।
সন্তানকে ইমানদার মুসলমান হিসাবে গড়ে তুলতে তাই এর কোনও বিকল্প নেই।