নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পর্কে ইসলাম

শিক্ষা ১৮ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফোকাস
নেতারা
Photo by Pressmaster from Pexels

প্রকৃত নেতারা সত্যিকার অর্থেই সবসময় মানবকল্যাণে সক্রিয় ও সচেতন থাকেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে অন্য কিছু মানুষের উপর আমিই প্রাধান্য দিয়ে থাকি, যাতে তারা পরস্পর থেকে কাজ নিতে পারে। আর আপনার উপর আল্লাহর রহমত ঐ ধনসম্পদ থেকে অধিক মূল্যবান যা ধনবানরা দুই হাত দিয়ে সংগ্রহ করছে।” (আল কুরআন-৪৩:৩২)

অন্য আয়াতে তিনি প্রাধান্যপ্রাপ্ত লোকদের কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন,

“বস্তুত আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মুত্তাকী বা ন্যায়পরায়ণ। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (আল কুরআন-৪৯:১৩)

আরবিতে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘জাতির নেতারা তাদের খাদেম বা সেবক’। জনগণের উপর কর্তৃত্ব করার জন্য নয়; বরং সমাজের সেবা করে সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকবেন, তাদের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা পালন করবেন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করে নেতারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। নেতা কোনো অবস্থায়ই তার অধীনস্থ লোকদের মধ্যে বৈষম্য করবেন না। সবার সাথে ইনসাফের সাথে আচরণ করবেন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতীয়তা বা অঞ্চল নির্বিশেষে সকলেই নেতার কাছ থেকে ইনসাফ পাবেন। এমনকি শত্রুর প্রতিও ইনসাফের আচরণ করতে নির্দেশ দেয় ইসলাম।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণা,

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে এই আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তাদের পাওনাদারদের নিকট পৌঁছে দাও এবং লোকদের মধ্যে যখন কোনো বিষয়ে বিচার করবে তখন ইনসাফের সঙ্গে করবে।” (আল কুরআন-৪:৫৮)

আরও এরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহর বিধিবিধানের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাকারী ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হও। আর কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্মক অবগত।” (আল কুরআন-৫:৮)

ইসলামের দৃষ্টিতে নেতাদের বিশেষ কিছু গুণাবলি থাকা জরুরি। যেমন-

১) সাধারণ মানুষের প্রতি নেতার ভালোবাসা থাকবে

আউফ ইবনে মালিক(রাযিঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের উত্তম নেতা হলো তারা, যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে। তারা তোমাদের জন্য দোয়া করে, তোমরাও তাদের জন্য দোয়া করো। আর তোমাদের নিকৃষ্ট নেতা হলো তারা, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা করো এবং যারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। আর তোমরা যাদের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করো।” সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “হে রাসুল! আমরা কি তলোয়ারের সাহায্যে তাদের মোকাবেলা করব”? তিনি বললেন, “না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের মধ্যে নামাজ কায়েম করতে থাকবে। তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের মধ্যে যদি তোমরা এমন কোনো জিনিস দেখতে পাও যা তোমরা অপছন্দ করো, তবে তোমরা তার কাজ ঘৃণা করতে থাকো। কিন্তু তার আনুগত্য থেকে হাত টেনে নিও না।” (মুসলিম)

২) নেতারা উদার, মহৎ ও ক্ষমাশীল হবেন

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “হে নবী! এটা আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহের বিষয় যে, আপনি এসব লোকের জন্য খুবই নম্র স্বভাবের হয়েছেন। আপনি যদি উগ্র স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তবে আপনার আশেপাশের লোকজন আপনার চারপাশ থেকে দূরে সরে যেত, অতএব তাদের ক্ষমা করে দিন। তাদের জন্য মাগফেরাতের দু’আ করুন এবং দ্বীনী বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। এরপর কোনো বিষয়ে আপনার সিদ্ধান্ত সুদৃঢ় হয়ে গেলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলুন। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা তার ওপর ভরসা করে কাজ করে।’ (আল কুরআন-৩:১৫৯)

মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষমার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বিশ্ব ইতিহাসে এমন আরেকটি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

৩) নেতারা দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ণ হবেন

নেতার উপর দায়িত্ব এলে তিনি সর্বোত্তমভাবে তা পালনের চেষ্টা করবেন। আয়েশা(রাযিঃ) বলেন, “আমার এ ঘরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে দু’আ করতে শুনেছি, হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যেকোনো কাজের দায়িত্বশীল নিযুক্ত হয়, এরপর সে লোকদেরকে কষ্টের মধ্যে ফেলে, আপনিও তাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিন। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যেকোনো বিষয়ে দায়িত্বশীল নিযুক্ত হয় এবং লোকদের সঙ্গে নম্র আচরণ করে, আপনিও তার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করুন।” (মুসলিম)

নেতার আরও কিছু গুণাবলি

যেহেতু ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা বিষয় নয়, তাই রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নেতাদেরও এসব গুণের অধিকারী হওয়া জরুরি। তাছাড়া নেতারা হবেন আল্লাহভীরু ও আল্লাহর প্রেমিক। নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সুমধুর আখালাকের অধিকারী। উন্নত নৈতিকতা ও নির্মল চরিত্রের অধিকারী। গঠনমূলক সমালোচনা, বাক-স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা দানকারী। জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। অসাধারণ সততা ও যোগ্যতার অধিকারী। দৃঢ়চিত্ত ও সাহসী। চিন্তাশীল ও উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের প্রতীক। নির্লোভ ও নির্মোহ। সংগঠন পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা বিধানে পারদর্শী। অধ্যবসায়ী, সাধক ও পরিশ্রমী। পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী। আস্থাভাজন ও অসহায়ের আশ্রয়দানকারী। শিক্ষানুরাগী ও শৈল্পিক মনোবৃত্তির অধিকারী। সব ব্যাপারে অগ্রগামী ও আদর্শ স্থাপনকারী।

যারা আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিংবা দেবেন, তারা ইসলাম প্রদত্ত গুণাবলি অর্জন করলে এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করে অগ্রসর হলে দেশের আরও উন্নতি ও সমৃদ্ধি আসবে ইনশাআল্লাহ।