পরনিন্দার ব্যাধি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন

Birds gossiping behind someones back
© Antares614 | Dreamstime.com

এই পৃথিবীতে বিভিন্ন কারণে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। তবে এসব কারণের ভেতরে অন্যতম একটি কারণ। এই গীবত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজবিধ্বংসী একটি ব্যাধি। গীবতের কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়। সৃষ্টি হয় দূরত্ব।

গীবত আরবী শব্দ, ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় গীবতের অর্থ হলো- কারো অনুপস্থিতিতে মুখে, লিখনীতে, ইশারা-ইঙ্গিতে অথবা অন্য কোনভাবে তার এমন কোন দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা যা শুনলে সে মনে কষ্ট পেতে পারে। চাই সে মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক। যদি এমন কোন দোষের কথা আলোচনা করা হয় যা আদৌ সে লোকের মধ্যে নেই, তবে সেটা গীবত নয় মিথ্যা অপবাদ। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা গীবতের চেয়েও গুরুতর অপরাধ। কেননা গীবতের সাথে সাথে এখানে মিথ্যাচারও সংমিশ্রণ হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে এখানে রাসুল (সা.) এর হাদীস উপস্থাপন করা হলো। একবার এক মহিলা সাহাবী রাসুল (সা.) এর খিদমতে হাযির হলেন, তখন হযরত আয়েশা (রা.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রয়োজন শেষে উক্ত মহিলা সেখান থেকে চলে গেলে হযরত আয়েশা (রা.) বললেন- হে আল্লাহর রাসুল (সা.) মহিলাটি কি বেঁটে আকৃতির নয়? হযরত আয়েশা (রা.) এর এ কথা শুনে রাসুল (সা.) খুবই মর্মাহত হলেন এবং বললেন- হে আয়েশা! তুমি গীবত করলে কেন? হযরত আয়েশা (রা.) আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন- হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমিতো মিথ্যা কিছু বলিনি! রাসুল (সা.) বললেন- আয়েশা! যদিও তুমি মিথ্যা কিছু বলোনি কিন্তু তুমি উক্ত মহিলার অনুপস্থিতিতে তার দৈহিক ত্রুটি বর্ণনা করেছো, এটাই গীবত।

একবার রাসূল (সা.) সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি গিবতের পরিচয় জানো?’ তারা বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত।’ তখন তিনি বললেন, ‘তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এরূপ কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তাই গিবত।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আমি যা বলি তা আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকলেও কি?’ রাসূল (সা.) বললেন, ‘তুমি যা বলো তার মধ্যে তা থাকলে তুমি তার গিবত করলে। আর যদি তার মধ্যে তা না থাকে তখন তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে।’ (মুসলিম, আসসাহিহ : ৬৭৫৮)

গীবতের ব্যাপারে রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে বলেনঃ “ হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সাধারণভাবে অন্যের ব্যাপারে আন্দাজ-অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। আন্দাজ-অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনাহের কাজ। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি কোরো না। কারো অনুপস্থিতিতে গীবত অর্থাৎ পরনিন্দা কোরো না। তোমরা কি মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে চাও? না, তোমরা তো তা ঘৃণা করো (গীবত করা মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান)। তোমরা সবসময় আল্লাহ-সচেতন থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরমদয়ালু। “ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১২)

নিঃসন্দেহে গীবত করা গুনাহার কাজ। তবে গীবত শুনা এবং বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাধা না দেওয়াও অপরাধ। হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, “রাসূল (স.) আমাদেরকে গীবত করা এবং গীবত শ্রবণ থেকে বারণ করেছেন”। (সীরাতে আহমাদিয়া)

গীবত শুধু যে নিজের অকল্যাণ ও ধ্বংসই বয়ে আনে তা নয়। সাথে সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়। যার প্রভাব আজকে আমরা আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি। হয়তো প্রতিবেশীর সাথে ভালো ভাবেই সময় কাটছিল। ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু গীবত করার কারণে দেখা গেল সেই প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। তৈরি হয় দূরত্ব, তৈরি হয় প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক। এবং এর ফল কখনোই ভালো হয় না। আমরা বর্তমানে আমাদের সমাজে যে অপরাধ, অপকর্ম, হিংসা বিদ্বেষ দেখতে পাচ্ছি তার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এই গীবত। কারণ গীবতের মাধ্যমে সম্পর্ক গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, স্রষ্টার রহমতে থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে শয়তান খুব সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারছে। এর ফল হিসাবে সামাজিক যে সুসম্পর্ক রয়েছে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি, নেতিবাচক চিন্তা এবং যথাযথ শিক্ষার অভাবে আমরা এই বিশৃংখল অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।

আমাদের সব সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে নতজানু হয়ে আশ্রয়প্রার্থনা করতে হবে যেন, আমরা গীবত থেকে সবসময় দূরে থাকতে পারি। আমরা যেন আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমরা যেন আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে পারি। আমরা যেন সব সময় গীবত থেকে দূরে থাকতে পারি। রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে হেদায়েত দান করুক।