পরামর্শ বা মাশওয়ারার প্রয়োজনীয়তা

Первый мусульманский ученый - Ибн Аббас

মুসলিম হিসেবে আমাদের নিকট সর্বোত্তম আদর্শ হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “এবং নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী”

আয়েশা(রাযিঃ) কে কেউ একজন নবীজির চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাঁকে বললেন, “তুমি কি কুরআন পড় না?” (অর্থাৎ, সমগ্র কুরআনই তো তাঁর জীবন)

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন,

“…এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন; আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন” (আল কুরআন-৩: ১৫৯)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহি নাযিল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে কেন তিনি এই কাজ করেন?

তার মধ্যে একটি কারণ হল, যেন রাসূলের দেখাদেখি অন্য লোকেরা এই আয়াতের অনুসরণ করতে পারে। আখেরি উম্মতের জন্য এটিকে সুন্নত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। (তাফসিরে কাবীর)

এছাড়া হাদীসে বর্ণিত আছে, “যদিও আমার জন্য পরামর্শের দরকার নেই, তথাপি আল্লাহ এটাকে আমার উম্মতের জন্য রহমত স্বরুপ দান করেছেন। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে পরামর্শ করে কাজ করে সে হেদায়েত থেকে গোমরাহ হয় না, আর তোমাদের মধ্যে যে পরামর্শ করে না সে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায় না” (বায়হাক্বী)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রেষ্ঠমানব ও নবী হওয়া সত্ত্বেও তার সাহাবীদের সঙ্গে বদর, উহুদ ও খন্দক যুদ্ধ করা, না করার ব্যাপারে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে পরামর্শ করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদীন ও সালফে সালেহীনও এদিকে বেশ সজাগ ও সতর্ক ছিলেন।

পরামর্শ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করার একটি উত্তম পন্থা। পরামর্শের সাথে কাজ করলে অনেক বিপদ ও অভিযোগ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়।

উম্মাহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ও শরয়ী ইজতেহাদের অবকাশ সম্পন্ন বিষয়ে পরষ্পর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অর্থাৎ যে বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধান নেই সেগুলোতে পরামর্শের বিকল্প নেই। যিনি প্রধান থাকবেন তিনি দ্বীনি ও দুনিয়াবি কোন কাজ করতে গেলে মজলিসে শুরা ডেকে পরামর্শ তলব করবেন।

তাফসীরে জাসসাসে আছে, “পরামর্শ তলব করতে হবে সেসমস্ত দ্বীনি ও দুনিয়াবি বিষয়ে যে ব্যাপারে কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়নি”

ছোট ও সাধারণ বিষয়ে পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই। কারণ এর ফায়দাও নেই এবং এ ব্যাপারে কোন দলীলও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও বৃহৎ স্বার্থ সম্বন্ধীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল মুসলমানের নিকট পরামর্শ চেয়েছেন। আবার কখনও কেবল প্রধান ও বিশেষজ্ঞ সাহাবীদের পরামর্শ নিয়েছেন।

পরামর্শে যদি মতানৈক্য ও ভিন্নতা দেখা দেয়, যা বড় ধরণের সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করে তাহলে সেক্ষেত্রে কুরআন ঘোষণা করেছে,

“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা ‘উলুল আমর’ তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়ো তাহলে তা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ করো- যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” (আল কুরআন-২:৫৯)

এক্ষেত্রে বহুবিধ মতের মধ্যে যে মতটি ওহির বিধানের অধিক কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করবে। যদি কাছাকাছি হওয়ার মতো কোনো মতকে প্রাধান্য দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অধিকাংশ লোকের মতকে গ্রহণ করা যাবে। ইচ্ছে হলে কম লোকের মতকে গ্রহণ করবে। আবার শুধু একটি মতকেও আমলে নেয়া যাবে। যেমন, আল্লামা কাতাদা রহ. বলেন, আল্লাহ তা’আলা নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, “পরামর্শের পর কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে অতঃপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে। তিনি গৃহিত পরামর্শর ওপরই জমে থাকতে হবে এটা বলেননি।” (তাফসিরে কুরতুবি)

তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের পর উসামা ইবনে যায়েদ রাযিঃ এর মদীনায় প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে হযরত আবু বকর রাযিঃ যৌক্তিক কারণে হযরত ওমরের পরামর্শকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খলিফা নিজের মতের ওপরও সিদ্ধান্ত নেয়ার ইখতেয়ার রাখেন।

ইসলামি খেলাফতের জন্য মজলিসে শুরা থাকা অপরিহার্য একটি অনুসঙ্গ। সব ধরণের জাতীয় কর্মসূচিসহ উম্মাহর সর্ববিষয়ের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনা আহলে শুরার মাধ্যমেই জাতির কাধে আরোপিত হয়। ইসলামি খেলাফতের সর্বযুগে মজলিসে শুরার ছিলো বিশেষ প্রভাব-প্রতিপত্তি। এটাকে ইসলামি খেলাফতের ঐতিহ্য, গৌরব ও প্রতীক বললে কোন অংশেই ভুল হবে না।