পরিবারের নবীন ও প্রবীণদের মাঝে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠুক

পরিবার Contributor
ফিচার
প্রবীণদের
© Dotshock | Dreamstime.com

এমন একটা সময় ছিল যখন দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, পিতা-মাতা সকলে মিলেই গঠিত ছিল যৌথ পরিবার। সন্তানকে আদর, ভালোবাসা দেওয়ার জন্য এবং তাদেরকে সময় দেওয়ার মত ছিল পরিবারে অসংখ্য সদস্য। এর ফলে পিতামাতার ব্যস্ততার কারণে সন্তান কখনও একাকিত্বে ভুগত না। মায়ের বকুনি খেয়ে সন্তান তখন পরিবারের প্রবীণদের যেমন, দাদা-দাদির বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে পারত।

আবার দাদা-দাদিরও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে অফুরন্ত অবসর সময় কাটাত। কিন্তু সময়ের দাবিতে এখন শুধু পিতা-মাতা, ভাই-বোন নিয়েই গড়ে উঠছে ছোট বা একক পরিবার। অনেক পরিবারে পিতা-মাতা দু’জনই আবার অনেক ক্ষেত্রেই কর্মজীবী। ফলে তাদের কর্মব্যস্ততা কিংবা সাংসারিক নানা জটিলতায় সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে না পারায় ধীরে ধীরে সন্তানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন থেকে। আর পারিবারিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন সন্তান যে বিপদগামী হবে তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিবারে প্রবীণদের ভূমিকা  

দাদা-দাদি, নানা-নানিরা বলতে গেলে পরিবারের প্রবীণরা ছোট শিশুদের জীবনকে পরিবর্তন করার এক মহান ক্ষমতা রাখেন। তাদের সাথে সময় কাটাতে পারলে আপনার সন্তানের মূল্যবোধ বাড়বে, তারা শিখতে পারবে নৈতিকতাসহ অনেক চারিত্রিক গুণাবলী। দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে পরিবারের নবীন সদস্যারা তাদের বহুদিনের বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতার গল্প শুনলে যেমন তাদের জ্ঞান বাড়বে, তেমনি বাড়বে কাজের দক্ষতা। পরিচিত হতে পারবে তাদের অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে। এর ফলে তৈরী হবে এক সমৃদ্ধ পারিবারিক বন্ধন।

অথচ আজকাল একক পরিবারগুলোতে কর্মজীবী পিতা-মাতারা এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, তাদের জন্য সন্তানকে সময় দেওয়া বা সঠিকভাবে যত্ন নেওয়া অনেকক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। অপরদিকে দূরে থাকা পিতা-মাতার নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়াটাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই এখন একক পরিবারের অনেক স্বামী-স্ত্রীই সন্তানের দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসছেন।

এতে দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে বাড়ির নবীন সদস্যরা যেমন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়, তেমনি বয়স্কদের একাকিত্বও খুব ভালভাবে দূর হয়। প্রবীণদের মধ্যে শেখানোর প্রবণতা বেশি থাকে, ফলে ছোটদের কবিতা, ছড়া, সূরা,ছোট গল্প বা ছোট ছোট হাতের কাজ ইত্যাদি সহজেই শিখিয়ে ফেলেন। এতে প্রবীনদের অবসর সময়ও অনেক ভালো কাটে, আবার তারা খুঁজে পায় বেঁচে থাকার প্রেরণা।

আজকের একঘেয়ে পরিস্থিতি 

সারা বিশ্ব এখন এক ভয়াবহ সময় পার করছে। কোনো দেশই কোভিড-১৯-এর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই অবনতির দিকে যাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই দীর্ঘদিন ধরে লকডাউন চলছে। আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে অফিস-আদালত খোলা থাকলেও স্কুল-কলেজ বন্ধ সেই মার্চ মাস থেকেই। তাই ঘরে বসে একাকী সময় কাটাতে কাটাতে নবীনরা একঘেয়ে হয়ে গেছে। পড়াশোনায় তাদের মনোযোগ একেবারেই থাকছে না। একাকীত্বের কারণে তারা খিটমিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছে। আসক্তি বাড়ছে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রকিক ডিভাইসে।

এর ফলে পাল্টে যাচ্ছে তাদের মনোজগত। অপরদিকে প্রবীণ সদস্যদের দিনগুলোও আগের মতো ভালো কাটছে না। বয়স্কদের করোনা ঝুঁকি বেশি থাকায় তারাও আগের মত মন চাইলে বাইরে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে বা নাতি-নাতনির হাত ধরে খোলাপ্রান্তরে হেঁটে বেড়াতে পারছেন না। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদেরকে ঘরেই অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনে বিষন্নতাও বাসা বাঁধছে। তাই এ সংকটকালীন সময়ে বাড়ির ছোট-বড় সদস্যদের ভালো থাকতে একে অন্যকে আরও বেশি সময় দিতে হবে। সংকটের এ সময়ে বাড়ির প্রবীণ ও নবীন সদস্যরা বাড়ির ছোট গণ্ডিতে থেকেও নানা উপায়ে আনন্দের সাথে সময় কাটাতে পারেন।

যেমন-করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ হল- স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ঠিক সময়ে ওষুধ আর নিয়মিত ফোনে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। করোনার খবরাখবর থেকে মাঝেমাঝে চোখ সরানোর পরামর্শও দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তার বদলে বরং কুরআন তেলাওয়াত শুনলে, বই পড়লে, শখের কিছু করলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যাবে। আত্মীয়-স্বজনদের নিয়মিত ফোনে খোঁজখবর নিলে তারাও ভরসা পাবেন।

পরিবারের প্রবীণদের সঙ্গে একত্র সময় কাটানো 

ব্যস্ততার কারণে আমরা যারা বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাই না, করোনাকালীন অবসরে সেটিকে খুব ভালোভাবে পুষিয়ে নিতে পারেন। বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্প করা, তাদের প্রিয় কোনো রান্না নিজ হাতে করে একসঙ্গে খাওয়া, শৈশব-

কৈশোরের মতো একসঙ্গে লুডু নিয়ে বসে যাওয়া, নিয়ম করে তাদের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলোর মাধ্যমে এখন আমরা তাদেরকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভালো রাখতে পারি। এতে পারিবারিক সম্পর্কের মিষ্টতাও সবার মাঝে ছড়াবে।

বাড়ির নবীন সদস্যরা বিকালে দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে ছাদে যেতে পারেন। ছাদের খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালে, খেলাধুলা বা দুষ্টমিতে সময় কাটালে উভয়ের মনই ফুরফুরে হয়ে উঠবে এবং পাশাপাশি শরীরও ভালো থাকবে।

শরীরিকভাবে সুস্থ থাকলে বাগান পরিচর্যা করতেও প্রবীণরা বেশ আনন্দ পান। এ কাজে তারা সাথে রাখতে পারেন বাড়ির নবীন সদস্যদের। এতে করে ছোটরা কাজও শিখবে এবং তাদের বিনোদনও হবে।

বাড়ির নবীন সদস্যদের টুকিটাকি ঘরের কাজ, দাদা-দাদিকে সেবাযত্ন, ওষুধ খাওয়ানো বা মনে করিয়ে দেয়ার দায়িত্বটি বুঝিয়ে দিতে পারেন। এর ফলে সময় কাটার পাশাপাশি ছোটরা শিখবে দায়িত্ববোধ। এভাবেই তৈরি হবে নবীন ও প্রবীণদের নিয়ে অটুট পারিবারিক বন্ধন।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.