পরিবারের মধ্যেই ভবিষ্যতের নেতা-নেত্রী কিভাবে গড়ে তুলবেন?

প্রকৃত মুসলমান যে হবে যে নিজের সন্তানকে সততার সঙ্গে সঠিকপথে বড় করে তুলবে। বিশেষ করে, সন্তানকে জীবনের পথে অগ্রগামী করে তুলতে পিতা মাতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আল্লাহর আশীর্বাদে আমাদের পারিবারিক বন্ধন এতটাই দৃঢ় হয় যে সন্তান সবকিছুই প্রাথমিকভাবে শেখে পরিবারের কাছ থেকে। অতএব, আমরা যা যা বলি, যে প্রকার ব্যবহার করি সবই আমাদের সন্তানকে প্রভাবান্বিত করতে পারে। শিশুরা পিতা ও মাতাকে অন্ধভাবে অনুসরণ ও অনুকরণ করে। তাই, নিজের সন্তানের মধ্যে নেতৃত্বসুলভ ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আনতে চাইলে আগে আপনাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে হবে। আপনাকে দেখেই আপনার সন্তান শিখবে জীবনে চলার উপায়। 

এই পৃথিবীতে নিজের উসুল বজায় রেখে চলা কঠিন, তাই একজন আদর্শ পিতা-মাতার উচিৎ প্রথমেই সন্তানকে শিক্ষা দেওয়া যে কীভাবে এই কঠিন পৃথিবীতে সে নিজের নীতি বজায় রেখে চলবে। এছাড়া বিপদে পড়লে মাথা ঠান্ডা রাখা বা চূড়ান্ত মানসিক চাপে ভেঙে যেন না পড়ে সেই  বিষয়েও সম্যক শিক্ষা তাকে দেওয়া বাবা মায়ের একান্ত দায়িত্ব। অপরাপর, সদর্থক চিন্তা, সহমর্মিতা, সহযোগীতা, ন্যায়, সময়ানুবর্তিতা ইত্যাদিও প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে পড়ে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বীজ ও জীবনে অগ্রপথিক হয়ে এগিয়ে যাওয়ার বীজ এভাবেই ছোটবেলা থেকে শিশুর মধ্যে বপন করে দিলে তবেই শিশু নিজের জীবনে সাফল্য পাবে। 

যদি কোনও মানুষ নিজের জীবনে দ্বিধাগ্রস্থ হয়, সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম না হয় তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে বড় হওয়ার সময় এই জিনিসগুলো তাকে কেউ শেখায়নি। অনেক পিতামাতা শাসন করার জন্য শিশুকে অসম্ভব কঠিন কথা বলেন, তাতে কিন্তু ক্ষতি বই লাভ হয় না। কঠিন কথা ও অত্যধিক তিরস্কারে শিশু বিচলিত হয়ে যায়। বুঝে উঠটে পারে না তার কী করা উচিৎ। এই বিভ্রান্ত অবস্থাতেই আস্তে-আস্তে তার জীবনে ঋণাত্মক প্রভাব শুরু হয়। অনেক পিতা-মাতা আবার ব্যক্তিগত ঈর্ষা শিশুর মধ্যে রোপণ করেন। সেই ঈর্ষার প্রভাবে শিশুর মধ্যে যেটুকু ভালত্ব থাকে তা আস্তে-আস্তে নষ্ট হতে শুরু করে। আবার কিছু পিতামাতা আবার নিজেদের জগতে এত ব্যস্ত থাকেন যে শিশুকে সময় দেওয়ার কথা তাঁদের মনেই থাকে না। এই ধরনের শিশুরা একা একা বড় হয়ে ওঠে এবং তাদের জীবনের ধারণা বেশ অন্যরকম হয়। অনেকক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এইসব শিশুরা নড়বড়ে হয়। 

অতএব বলা যায়, একজনের শিশুর বড় হয়ে ওঠার সময় তার সামনে একজন সৎ ও সদর্থক রোল মডেলের ভীষণ প্রয়োজন। নয়তো পরবর্তীতে নিজের জীবনেই শিশুর নানাবিধ সমস্যা হয়। 

ইমানদার মুসলমান পিতামাতার উচিৎ আল্লাহর উপহার হিসেবে নিজের সন্তানকে দেখা ও তাকে সর্বোত্তম ভাবে বড় করে তোলা। বিশেষ করে, আল্লাহ চান , তার সমস্ত অনুগামীরাই যেন নিজেদের জীবনে অগ্রপথিক হতে পারে। 

কিন্তু কীভাবে সন্তানকে অগ্রগামী বা লিডার বানিয়ে তুলবেন?

১। উদাহরণ সহযোগে শেখানঃ
যদিও আপনার সন্তান আপনার থেকেই জীবনবোধের পাঠ শিখবে, তাও মনে রাখবেন জীবনের সব ক্ষেত্রে আপনি সেরা নন। তাই যে বিষয়ে সন্তানকে শিক্ষা দেবেন তার সঠিক ও সেরা একজন রোলমডেলের উদাহরণ দেবেন সন্তানের কাছে। তাকে উৎসাহিত করবেন সেই রোলমডেলকে অনুসরণ করতে।

২। দায়িত্ব নিনঃ
আপনার সন্তান যেন দেখে যে আপনি আপনার জীবনের সব সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিয়েছেন, আপনার কথার দাম রয়েছে। আপনি জীবনে যে লক্ষ্যস্থির করেন সেই লক্ষ্য অর্জন করায় আপনার চেষ্টার ত্রুটি নেই… এমনটা আপনার সন্তানের যদি মনে হয় তাহলে নিজের জীবনে সে-ও একই ভাবে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাবে।

৩। প্রশংসা করুনঃ
আমরা প্রশংসা পেলে আরও ভাল কাজ করি। আপনার সন্তানও কিন্তু তাই। তার ভাল কাজে প্রশংসা করতে শিখুন। প্রশংসার ফলে সে উৎসাহিত হবে, সেই উৎসাহ থেকে কর্মঠ হওয়ার ইচ্ছে আসবে আরও। 

৪। মতামত দিতে উৎসাহিত করুনঃ
বর্তমান সমাজে দুই ধরনের মানুষ দেখা যায়, একদলের আদৌ কোনও মতামত নেই। আরেকদলের সব বিষয়ে বিস্তর মতামত। আপনার সন্তানকে এই দুইদলের থেকে আলাদা ভাবে বড় করে তুলুন। তাকে সৎ ও যুক্তিপূর্ণ মতামত দিতে শেখান। আপনি নিজে থেকে কোনও বিষয়ে তার মতামত জানতে চান, দেখবেন, এভাবেই একসময় আপনার সন্তান সঠিক মতামত দিতে শিখবে।

৫। কাজ শেখানঃ
সন্তানকে ছোট-ছোট কাজ দিন। সেগুলো সম্পূর্ণ করতে পারলে তাকে ছোটখাটো উপহার দিন। দেখবেন, এভাবে তার কাজ সম্পূর্ণ করার তৃপ্তির সম্পর্কে ধারণা আসবে। 

৬। সিদ্ধান্ত নিতে শেখানঃ
সপ্তাহ একদিন লাঞ্চের সিদ্ধান্ত নিতে দিন আপনার সন্তানকে। প্রশংসা করুন সেই সিদ্ধান্তের। এভাবেই আপনার সন্তান হয়ে উঠবে ডিসিশন-মেকার।

৭। ধৈর্য ও সাহস শেখানঃ
জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে গেলে এই অবশ্য প্রয়োজনীয় দুটি স্বভাব আপনার সন্তানের মধ্যে গড়ে তুলুন।

৮। স্বকীয়তা বজায় রাখতে শেখানঃ
অনেকসময় রোলমডেলকে অনুসরণ করতে গিয়ে শিশু নিজ্র স্বকীয়তা হারায়। সেই বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। তাকে নিজের মতো ভাবনা চিন্তা করতে দিন।

অতএব, সন্তানকে অগ্রপথিক করে তুলতে চাইলে তার জীবনে নিজে অগ্রপথিক হয়ে উঠুন আগে। মহান আল্লাহ তা’আলার অসীম করুণা বর্ষিত হোক আপনার উপর।