SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

পর্তুগাল: ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামী শাসনের আর এক অধ্যায়

ইউরোপ ২৩ জানু. ২০২১
ফোকাস
পর্তুগাল
Detail of the entrance to the Central Mosque of Lisbon, Portugal. © Antonio Ribeiro | Dreamstime.com

অনেকেই এটা ভেবে অবাক হতে পারেন যে, পর্তুগাল দীর্ঘ সময় মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে, যখন মুসলমানরা স্পেনের আন্দালুসিয়াতে শাসন করত, তারও ৫০০ বছর আগে থেকে পর্তুগালে ইসলামের শাসন কায়েম হয়েছিল। সেই সময়ে পর্তুগালকে আল-গার্ব আল-আন্দালুস (স্পেনের আল-আন্দালুসের পশ্চিম) বলা হত।

প্রথম সেভিয়ে এবং তারপরে কর্ডোবা স্পেনের মুসলিম রাজ্যের রাজধানী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল, অন্য দিকে সিলভস শহরটি ছিল মধ্যযুগীয় পর্তুগালের মুসলিম রাজ্যের রাজধানী।

মুসলমানদের হাতে তৈরি সমৃদ্ধশালী পর্তুগাল

কৃষিক্ষেত্রে মুসলমানদের নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তন এবং কঠোর পরিশ্রম পর্তুগালকে সমৃদ্ধ করেছিল। এখনও পর্যন্ত, সাধারণ পর্তুগিজ ক্রিয়াপদ মৌরেজার (mourejar) অর্থ মুর অর্থাৎ মুসলিমের মতো কাজ করা। এই শব্দ প্রকৃতপক্ষে অস্বাভাবিক পরিশ্রম এবং দৃঢ়তার অর্থ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে, পর্তুগীজ ভাষায় বহু বিদেশী শব্দ, বিশেষত আরবী উৎসের শব্দে পূর্ণ।

সমসাময়িক স্প্যানিশ খ্রিস্টানদের অনুসরণ করে, পর্তুগীজ খ্রিস্টানরা ধীরে ধীরে মুসলিমদের বলপূর্বক দক্ষিণ দিকে পাঠাতে শুরু করেন, যার ফলে শেষ ঘাটি আলগার্ভ কোস্ট-ও ১২৪৯ সালে মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দালুসিয়ার স্পেন সংলগ্ন এলাকায়, দ্য এমিরেট অফ গ্রানাটা, গ্রানাডা, পরবর্তী ২৫০ বছর মুসলিমদের অধীনে ছিল।

আন্দালুসিয়ায় শতাব্দী দীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে সেভিয়ের গিরাল্ডা, কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ এবং গ্রানাডার আলহাম্ব্রা প্রাসাদের মতো স্থাপত্যশিল্প তৈরি হয়েছিল, একই ভাবে পর্তুগালেও ইসলামিক আমলে কয়েকটি বড় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছিল। দামেস্ক বা মারাকেশের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আন্দালুসিয়ার শহরগুলি ইসলামী সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হিসাবে বিকশিত হয়েছিল, কিন্তু পর্তুগাল সর্বদা মুসলিম বিশ্বের বহির্ভাগে অবস্থান করেছে এবং এর শাসকরা স্থাপত্য নির্মাণে খুবই সামান্য বিনিয়োগ করেছিলেন। আজ, অ্যালেন্তেজোর মর্তোলা শহরে একমাত্র মসজিদের আংশিক অবশেষ রয়েছে, যা রিকনকুইস্টার(ক্রুসেড)-এর পরে ক্যাথলিক চার্চে রূপান্তরিত হয়েছিল। আলগার্ভের জলাশয়টি যা পর্তুগালের কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে সহায়তা করেছিল,তা বর্তমানে এমন মুসলিম আমলের শেষ চিহ্নে পরিণত হয়েছে।

পর্তুগাল-এ ভাষাসম্ভার ও তাতে আরবীর অবদান

পর্তুগীজ ভাযায় যত আরবী উৎসের শব্দ রয়েছে, তাদের অধিকাংশের অর্থের সাথে খাবার, চাষবাস বা কায়িক শ্রমের যোগ রয়েছে। এমনই একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হল ওক্সালা (“oxalá”) – যা সরাসরি ইনশাল্লাহ থেকে এসেছে, যার অর্থ হল আল্লাহের ইচ্ছা। লিসবন নামে পরিচিত শহরটির নামের উদ্ভব হয়েছে আল-ইশবুন থেকে, যা পূর্বে এই শহরের নাম ছিল। বিখ্যাত শহর আলগার্ভের নাম সরাসরি এসেছে আল-গার্ভ আল-আন্দালুস থেকে। শুধুমাত্র এই শহরগুলির নামই আরবী থেকে আসেনি, বরং পর্তুগালে আল শব্দ দিয়ে শুরু যত জায়গা রয়েছে, প্রতিটিরই উৎস হল আরবী। কারণ আরবী ভাষায় আল শব্দের অর্থ ইংরেজি ভাষায় দ্য (‘The’)-এর মতো। লিসবনের মধ্যে আলফামা জেলা রয়েছে, যা হল এর অন্যতম উদাহরণ।

প্রকৃতপক্ষে, ভূমধ্যসাগর জুড়ে এর অস্তিত্ব রয়েছে, সার্ডিনিয়ার আলঝেরো থেকে শুরু করে দক্ষিণ স্পেনের আলজেসিরাস পর্যন্ত—সবই এর উদাহরণ। এছাড়াও পর্তুগীজ ভাষা আরবী শব্দভাণ্ডার থেকে অনেক শব্দ গ্রহণ করেছে, যেমন- আজেইটোনা (অলিভ), এবং গাররাফা (বোতল)।

অন্যান্য ইসলামী সাম্রাজ্য সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন

মুসলিমদের শাসনকালের পরে, বর্তমানে খ্রিস্টানদের শাসনাধীন, পর্তুগাল মুসলিমদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব দেখাতে শুরু করে। মনে করা হয়, ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য, মিশরের মামলুক এবং পরবর্তী কালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে পর্তুগালের সম্পর্কের অবনতিই ছিল এর মূল কারণ। ইসলাম-পরবর্তী পর্তুগালও দুর্ভাগ্যবশত আটলান্টিকের ক্রীতদাস ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল, যার মধ্যে অধিকাংশ ক্রীতদাসই নিয়ে আসা হত আফ্রিকা (যাঁদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন মুসলমান) এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে— আমেরিকায় সরবরাহ করার জন্য।

মনে রাখার মতো কিছু বিষয়

আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে কাতারে, যেটি হল বিশ্বের অন্যতম ধনী মুসলিম রাষ্ট্র। এই সময় মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম ইউরোপের বুকে কোনও নতুন ঘটনা বা ধর্ম নয়। বরং এর গভীর ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে, যা এই মহাদেশের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ। বিশ্বকাপের পাশাপাশি ইউরো কাপ বা এই ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বহু মুসলিম দেশও অংশগ্রহণ করে, যেমন- তুরস্ক, আলবানিয়া, স্পেন, পর্তুগালের মতো প্রাক্তন মুসলিম দেশ, এবং রোমানিয়া, হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশও এতে অংশগ্রহণ করে। তবে বেশ কিছু দেশ যেমন- ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানীর মতো এমন বহু দেশ রয়েছে যাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো।

ইসলাম হল ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। পর্তুগালের জন্য, আমরা দোয়া করি যেন এই দেশগুলিতে আরও একবার ইসলাম বিকাশ লাভ করে। এর আগেও মুসলিম শাসনের অধীনেই এই দেশগুলির প্রকৃত উন্নয়ন হয়েছিল। ভবিষ্যতেও ইসলামের হাত ধরেই আরও এক বার এই দেশগুলি সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।