পশ্চিমকে অন্ধকার যুগ থেকে আলোকিত করেছে ইসলামি সভ্যতা

arabian astronomy book
A photograph image showing the ancient hand written book of astronomical studies by the arab scholars. ID 23749171 © Joanne Zhe | Dreamstime.com

অনেকের ধারণা ধর্ম আসলে জ্ঞান, গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরোধী। লেখাপড়া যেখানে মানুষকে আলোকপ্রাপ্ত করে না সে ক্ষেত্রে এরকম ভ্রান্ত বিচার অমূলক নয়। নেতিবাচক প্রচার ইসলামকে পাশ্চাত্যের ভয়াল প্রতিপক্ষহিসেবে চিহ্নিত করেছে। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীতার প্রধান ধারাটি এই প্রচারণাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। অথচ যদি সত্যকে অনুসন্ধান করা হয়, তাহলে স্পষ্ট হবে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ইসলাম ছিল একটি আশীর্বাদ, এক আলো, এক সূর্যোদয়। অন্তত জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব এতই ব্যাপক, যার কিয়দংশ প্রচারিত হলেই পশ্চিমা দুনিয়ায় পথভ্রষ্ট ও হিংস্র ইসলামোফোবিয়া থমকে দাঁড়াত। যে তরুণেরা শুনেছে, মুসলিম মানেই বর্বর ও উচ্ছেদযোগ্য প্রতিপক্ষ, সে জানত না মুসলিম মানে, বন্ধু এবং শিক্ষকও। পশ্চিমা দুনিয়ায় এমন বহু সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী আছেন, যাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে এ সত্য।

ইউরোপ যখন অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের গভীর ঘুমে অচেতন তখন এশিয়া আফ্রিকায় ইসলামের আলোকধারা জ্ঞান ও সভ্যতামন্ডিত নতুন এক বিশ্বের জন্ম দেয়। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুবিচার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন সবদিক থেকেই মানব জাতিকে ইসলাম এক অনন্য সভ্যতা দান করে। পাশ্চাত্যের ওরা এখন গণতন্ত্রের সাংঘাতিক প্রবক্তা সেজেছেন। আর ইসলামকে বলা হচ্ছে মানবতা বিরোধী, অসহিষ্ণু ইত্যাদি। এসব কথা বলার সময় তারা অতীতের দিকে তাকায় না এবং নিজের চেহারার উপর একবারও নজর ফেলে না। যে গ্রীক ও রোমান সভ্যতা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, সে সভ্যতায় গণতন্ত্রতো দূরের কথা কোনপ্রকার সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের কোন স্থান নেই। অভ্যন্তরীণভাবে তাদের নীতি ছিল ‘সারভাইভেল অব দ্য ফিটেস্ট’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তারা অনুসারী ছিল ‘মাইট ইজ রাইট’ এর। গ্রীকরা বলতো ‘যারা গ্রীক নয় তারা গ্রীকদের ক্রীতদাস হবে এটা প্রকৃতির ইচ্ছা।’ আর রোমানরা মনে করতো, তারাই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর সব সম্পদ তাদের জন্যই। ইউরোপের এই অন্ধকার যুগে মানবাধিকার বলতে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। পরাজিত ও ভাগ্যাহতদের নিহত হওয়া অথবা চিরতরে দাসত্বের নিগড়ে বন্দী হওয়াই ছিল ভবিতব্য। নারীদের অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ অধিকার থাকা দূরের কথা তারা পূর্ণ মানুষ কিনা তাই নিয়ে ছিল বিতর্ক। শত্রু  ও বাদী জাতীয় লোকদের কোন মানবিক অধিকার স্বীকৃত ছিল না। এই দুঃসহ অন্ধকার হতে ইসলাম মানুষকে মুক্ত করে, পৃথিবীকে নিয়ে আসে আইনের শাসনের আলোকে।

ইসলাম জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর ধর্ম বলেই জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশ্বসভ্যতাকে নতুন সাজে সজ্জিত করেছে। খ্রিষ্টীয় এগার শতক হতে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞান চর্চার অপরাধে পাশ্চাত্য যেখানে ৩৫ হাজার মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সেখানে অষ্টম শতক হতে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কাল ছিল মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চা ও আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মার্টন তাঁর পাঁচ খন্ডে সমাপ্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞান ও আবিষ্কার ইসলামের অবদানকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন।৪ তাঁর এই ইতিহাস বলে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ-নিরবচ্ছিন্ন এই ৩৫০ বছর জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানদের চূড়ান্ত আধিপত্যের যুগ। এই সময় যেসব মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জারীর, খাওয়ারিজম, রাজী, মাসুদী, ওয়াফা, বিরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে আল হাইয়াম এবং ওমর খৈয়াম। এই বিজ্ঞানীরা যখন পৃথিবীকে আলো ছড়াচ্ছিল, তখন সে আলোতে স্নাত হচ্ছিল অন্ধকার ও ঘুমন্ত ইউরোপ। ইউরোপীয় ছাত্ররা তখন স্পেন ও বাগদাদের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালগুলিতে মুসলিম বিজ্ঞানীদের পদতলে বসে জ্ঞান আহরণ করছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীদের এই ইউরোপীয় ছাত্ররাই জ্ঞানের আলোক নিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এরই ফল হিসেবে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পর ইউরোপে ক্রিমোনার জেরার্ড, রজার বেকন এর মত বিজ্ঞানীদের নাম সামনে আসতে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মাটনের মতে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুশ’ পঞ্চাশ বছরের এ সময়ে বিজ্ঞানে অবদান রাখার সম্মানটা মুসলমানরা ও ইউরোপ ভাগাভাগি করে নেয়। এই সময়ের মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে নাসিরউদ্দীন তুসি, ইবনে রুশদ এবং ইবনে নাফিস এর মত বিজ্ঞানীরা। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চায় গৌরবময় সূর্য অস্তমিত হয় এবং পাশ্চাত্যের কাছে হারতে শুরু করে মুসলমানরা। অবশ্য এর পরেও মুসলমানদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চমক কখনও কখনও দেখা গেলেও (যেমন ১৪৩৭ সালে সমরখন্দে আমির তাইমুর পৌত্র উলুগ বেগের দরবার এবং ১৭২০ সালে মোগল স¤্রাটের দরবারে জীজ মোহাম্মদ শাহীর সংকলন) তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।

তবে বিজ্ঞানে ছয়শ’ বছরের যে মুসলিম অবদান তা ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি এবং বিজ্ঞান রেনেসাঁর জনক। মুসলমানরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও জনক। ‘ইউরোপ যখন গির্জা ও মঠ ব্যতীত অপর সকল শিক্ষালয়ের কথা কল্পনাও করে নি, তার শত শত বছর আগে মুসলমানরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল, যেখানে হাজারো ছাত্র উন্নত পরিবেশে পাঠগ্রহণ করতো।’৫ গ্রন্থাগার ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও ইসলামি সভ্যতার অবদান। মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল লাখো গ্রন্থে ঠাসা। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর তখন ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিল। ঐতিহাসিক Dozy এর মতে স্পেনের আলমেরিয়ার ইবনে আব্বাসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে অসংখ্য পুস্তিকা ছাড়া শুধু গ্রন্থের সংখ্যাই ছিল ৪ লাখ।৬ এসব মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারটি ছিল বিজ্ঞান চর্চা ও বৈজ্ঞানিক সৃষ্টির সুতিকাগৃহ।

বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই ছিল মুসলমানদের গৌরবজনক বিচরণ। গণিত শাস্ত্রে রয়েছে মুসলমানদের মৌলিক অবদান। আমরা যে ৯ পর্যন্ত নয়টি সংখ্যা ব্যবহার করি, তার অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল। কিন্তু শূণ্য (Zero) এর বিষয়টি সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে মোহাম্মদ ইবনে মুসা সর্বপ্রথম ‘শূণ্য’ আবিষ্কার করেন। গণিত শাস্ত্রে ইনিই সর্বপ্রথম দশমিক বিন্দু (decimal notation) ব্যবহার করেন। সংখ্যার স্থানীয় মান (value of position) তারই আবিষ্কার। বীজগণিত বা ‘এলজেব্রা’ মুসলমানদের সৃষ্টি। মুসলিম গণিতজ্ঞ আল-জাবের এর নাম অনুসারে ‘এলজেব্রা’ নামকরণ হয়। শিঞ্জিনী (sine), সার্শ-জ্যা (tangent), প্রতি স্পর্শ ক্যক (co-tangent) প্রভৃতি আবিষ্কার করে বর্তুলাকার ক্রিকোণমিতির উন্নতি করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আলোক বিজ্ঞানে focus নির্ণয়, চশমা আবিষ্কার মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজানের কীর্তি। কিন্তু রজার বেকন এই আবিষ্কার পাশ্চাত্যে আমদানি করে নিজেই এর আবিষ্কারক সেজেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘মানমন্দির’ (observatory) ব্যবহার মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এর আগে মানমন্দির সম্পর্কে কোন ধারণা কারও ছিল না। গণনা দ্বারা রাশিচক্রের কোণ (angle of the ecliptic), সমরাত্রি দিনের প্রাগয়ণ (pre-cission of the equinoxes), Almanac (পঞ্জিকা), Azimuth (দিগন্তবৃত্ত), Zenith (মস্ত্রকোর্দ্ধ নভোবিন্দু), Nadir (অধঃস্থিত নভোবিন্দু) প্রভৃতির উদ্ভাবন মুসলিম বিজ্ঞানীদের কীর্তি। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চিকিৎসার বিজ্ঞানকে প্রকৃত বিজ্ঞানে রূপ দান করেন।৭ ইউরোপে যখন খ্রিস্টান গির্জা ঔষধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মানুষ্ঠান দ্বারা রোগের ব্যবস্থা নিতেন, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান মুসলমানদের হাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানী আল রাজীর চিকিৎসা বিষয়ক ‘বিশ্বকোষ’ দশখন্ডে সমাপ্ত। এই চিকিৎসা বিশ্বকোষ ও ইবনে সিনা’র ব্যবস্থা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল। বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা কেমিষ্ট্রির নামকরণই হয় মুসলিম বিজ্ঞানী ‘আল কেমী’র নামানুসারে। কেমিষ্ট্রি এর সুবাসার (Alcohol), কাঠ ভস্ম ক্ষারের ধাতার্বকমুল (potassium), পারদবিশেষ (corrosive sublimate), কার্ষকি (Nitrate of silver), যবক্ষার দ্রাবক (Nitric Acid), গন্ধব দ্রাবক (Sulphuric Acid), জুলাপ (Julep), অন্তসার (Elixer), কর্পুর (Caurphar) এবং সোনামুখী (senna) প্রভৃতি মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। ভূগোল শাস্ত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অবিস্মরণীয়। ইউরোপ যখন মনে করতো পৃথিবী সমতল, তখন বাগদাদে গোলাকার পৃথিবীর পরিধি নির্ণিত হয়েছিল। চন্দ্র যে সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়, একথা মুসলিম বিজ্ঞানীরা জানতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের কক্ষ নির্ধারণ করেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ কম্পাস যন্ত্র মুসলিম বিজ্ঞানীর আবিষ্কার। মুসলমানরা নকশার বৈচিত্র্য ও সৌন্দয এবং শিল্প কৌশলের পূর্ণতা বিধানে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, লৌহ, ইস্পাত প্রভৃতির কাজে তারা ছিল দক্ষ। বস্ত্র শিল্পে এখনো মুসলমানদের কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। উত্তম কাঁচ, কালী, মাটির পাত্র, নানা প্রকার উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুত করা সহ রং পাকা করার কৌশল ও চর্ম সংস্কারের বহুবিধ পদ্ধতি সম্পর্কে মুসলিম কৌশলীরা ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাদের এসব কাজ ইউরোপে খুব জনপ্রিয় ছিল। সিরাপ ও সুগন্ধি দ্রব্য তৈরিত মুসলমানদের ছিল একাধিপত্য। মুসলমানদের কৃষি পদ্ধতি ছিল খুবই উন্নত। তারা স্পেনে যে কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করেন, ইউরোপের জন্য তা তখনও বিস্ময়। পানি সেচ পদ্ধতি তাদের উৎকৃষ্ট ছিল। মাটির গুণাগুণ বিচার করে তারা ফসল বপণ করতেন। সারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা জানতেন। ‘কলম’ করার ও নানা প্রকার ফল-ফুলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে তারা ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ।

ফরাসি বুদ্ধিজীবী গুস্তাবলি বা, ঐতিহাসিক রবার্ট ব্রিফল্ট, ডি এইচ রবার্টস, মান্টোগোমারির মতো সত্যসন্ধ গবেষকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আরবদের গবেষণা ও আবিষ্কারের বদৌলতেই বিজ্ঞানময় আধুনিক যুগের সূচনা ইউরোপ করতে পেরেছিল।

জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ মুসলিমদের এমন বহু বিষয় আছে, যার গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করছে পাশ্চাত্য। কিন্তু এটাকে গভীর যত্নে আড়াল করা হয়েছে, দেখানো হয়েছে বিপরীত চিত্র। তা তৈরি করেছে পশ্চিমের উল্টো চোখ, উল্টো মন। ফলে ঘৃণা ও সঙ্ঘাতের আগুন ঢুকে পড়েছে অনেক গভীরে, যা থেকে বেরিয়ে আসা পশ্চিমা দুনিয়ার নিজের প্রয়োজনেই আজ জরুরি।