পশ্চিম আফ্রিকায় সাভানা ও ঘানা অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার

dreamstime_s_109748661

মুসলিম ভূগোলবিদ এবং ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন লেখা থেকে আফ্রিকার মুসলিম শাসক ও জনগণ সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আল-খয়ারজিমি, ইবনে মুনাব্বাহ, আল-মাসুদি, আল-বাকরী, আবুল ফিদা, ইয়াকুত, ইবনে বতুতা, ইবনে খালদুন, ইবনে ফাদলাল্লাহ আল-উমারী, মাহমুদ আল-কাতি, ইবনে আল মুখতার ও আবদ-রহমান আল-সা’দি প্রমুখ। ইসলাম পশ্চিম আফ্রিকার সাভানা এলাকায় পৌঁছেছিল অষ্টম শতাব্দীতে, আর সেই সময় থেকেই পশ্চিম আফ্রিকার লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। 

বিশিষ্ট আরব ঐতিহাসিক এবং আফ্রিকান পণ্ডিতরা ঘানা, মালি, সোংহায় এবং কেনেমে বোর্নুর সাম্রাজ্য সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। তাঁরা আফ্রিকার বিখ্যাত বাণিজ্য রুটের কথা লিখেছেন – সিজিলমাসা থেকে তাঘাজা, আওদাগস্ট, যেখান থেকে ঘানার সাম্রাজ্যের উৎপত্তি হয়েছিল, এবং সিজিলমাসা থেকে টুয়াত, গাও ও টিম্বাকটু পর্যন্ত।

আল-বাকরি একাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ঘানাকে অত্যন্ত উন্নত এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মালি-তে ইসলামের প্রভাব সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং মানসা মুসার শাসনের বর্ণনা দিয়েছেন, যার খ্যাতি সুদান, উত্তর আফ্রিকা এবং ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

পশ্চিম আফ্রিকার সাভানায় প্রথম পৌঁছেছিল ইসলাম

ইসলাম অষ্টম শতাব্দী-তে সাভানা অঞ্চলে পৌঁছেছিল, সেই সময় থেকেই মুসলিম-আরব ইতিহাসবিদরা পশ্চিম আফ্রিকার ইতিহাস লেখা শুরু করেন। বিখ্যাত পণ্ডিত ইবনে মুনাব্বাহ ৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে এই এলাকা নিয়ে লিখেছিলেন, এরপরে আল-মাসুদি ৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এই নিয়ে লেখেন। ইসলাম যেহেতু সাভানা অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছিল, তাই স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।

ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসারের ফলে নতুন সংস্কৃতি স্বাভাবিক ভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং তার ফলে সাক্ষরতার প্রবর্তন ও প্রসারও হয়েছিল। এর ফলে আগামী শতাব্দীতে সুদানের কিছু অংশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। টেকুর সাম্রাজ্যের ডায়ো’ওগো রাজবংশ ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁরা ছিলেন প্রথম নিগ্রো, যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল।   

এই কারণেই মুসলিম-আরব ঐতিহাসিকরা বিলাদ আল-টেকুরকে ‘কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমানদের দেশ’ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। রাবিসের পুত্র ওয়ার-জাবী ছিলেন টেকুরের প্রথম শাসক, যাঁর রাজত্বকালে ইসলাম দৃঢ় ভাবে টেকুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ইসলামী শরীয়া আইন কার্যকর করা হয়েছিল। এর ফলে জনগণকে একটি অভিন্ন মুসলিম আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল। ১০৪২ খ্রিস্টাব্দে যখন আলমোরাভিডসের আল-মুরবিতুন টেকুর আক্রমণ শুরু করেছিলেন, ততদিনে ইসলাম এই অঞ্চলের লোকদের উপরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

১৫১১ সালে আল-ইদ্রিসি টেকুর দেশকে ‘সুরক্ষিত, শান্তিপূর্ণ ও প্রশান্তি’র দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। টেকুরের রাজধানী শহরটিকেও টেকুর বলা হত, যা একটি বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা সেখানে বিক্রি করার জন্য গ্রেটার মরক্কো থেকে পশম নিয়ে আসত এবং তার বিনিময়ে নিজেদের সাথে সোনা এবং পুঁতি নিয়ে যেত। 

এই অঞ্চলের সংস্কৃতি

এই অঞ্চলের প্রচুর লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। আরব ইতিহাসবিদদের কাছে এই অঞ্চল মূলত কৃষ্ণাঙ্গদের দেশ, বিলাদ আল-সুদান হিসাবে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগে এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত সাম্রাজ্যগুলি ছিল: ঘানা, মালি, সোংহায় এবং কেনেমে বোর্নু। যে বিশিষ্ট আরব ঐতিহাসিকরা এই গৌরবময় ভূমি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আল বাকরী, আল-মাসুদি, ইবনে বতুতা এবং ইবনে খালদুন। এই আলেমদের পাশাপাশি স্থানীয় আলেম-দের কাজও এখানে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যেমন, আল-সাদী দ্বারা লিখিত তারিখ আল-সুদান, সুদানের ইতিহাস এবং মুহাম্মদ আল-কাতি রচিত তারিক আল-ফাত্তাস।

বিখ্যাত বাণিজ্যিক পথ ছিল, যেমন- সিজিলমাসা থেকে তাঘাজা, আওদাগস্ত, যেখান থেকে ঘানা সাম্রাজ্যের উৎপত্তি হয়েছিল এবং আর একটি ছিল সিজিলমাসা থেকে টুয়াত, গাও এবং টিম্বাকটু। আবার অনেকেই ছিলেন যা বর্তমান নাইজেরিয়াকে ফেজের মাধ্যমে ত্রিপোলির সাথে বোর্নু এবং টিউনিসিয়ার সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। এই রুটগুলির জন্য উপরে উল্লিখিত জায়গাগুলি বিখ্যাত বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। এই বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি অবিচ্ছিন্নভাবে ইসলামী শিক্ষা এবং সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। 

প্রাচীন ঘানা সাম্রাজ্যে ইসলাম

মুসলিম ভূগোলবিদ আল-বাকরি ঘানার প্রাচীন সোনিনকে সাম্রাজ্যের প্রাথমিক বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর কিতাব ফী মাসালিক ওয়াল মামালিক (বিভিন্ন রাস্তা এবং সাম্রাজ্যের বই)-এ ১০৬৮ সালের ঘানাকে অত্যন্ত উন্নত দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। অর্থনৈতিকভাবে এটি একটি সমৃদ্ধ দেশ ছিল। বাদশাহ মুসলিম দোভাষীদের নিয়োগ করেছিলেন এবং তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রী ও কোষাধ্যক্ষও ছিলেন মুসলমান। মুসলিম মন্ত্রীরা প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন এবং আরবিতে সমস্ত ঘটনা লিখে রাখতেন। 

ঘানা শহর মূলত সমতলে অবস্থিত ছিল, এবং এর এখানে মূলত মুসলমানদের বসবাস ছিল। সেই আমলে এই শহরে ১২টি মসজিদ ছিল, এবং প্রতিটি মসজিদের ইমাম, মুয়েজিন ও কুরআন তিলাওয়াতকারী ছিলেন। এই শহরের অধিকাংশ পুরুষই শিক্ষিত মুসলিম ছিলেন।