পারস্য থেকে ব্রিটেনে যাত্রা করল ‘অ্যালগরিদম’

algorithm
ID 154310758 © Anatoly Stojko | Dreamstime.com

আপনি হয়তো ধারণা করতে পারেন, ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি তুলনামূলকভাবে আধুনিককালে প্রচলিত খুব পরিচিত একটি শব্দ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৯০০ বছর পূর্বে এই শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। বিখ্যাত পারসিক মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারেজমির নাম থেকে অ্যালগরিদম শব্দটি এসেছে । ৭৮০ ঈসায়ীর দিকে তিনি তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খাওয়ারেজম নামক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, যেটি বর্তমানে আধুনিক উজবেকিস্তান রাষ্ট্রের অর্ন্তভুক্ত। জন্মস্থানের নামের অনুসারে তার নামের শেষে আল-খাওয়ারেজমি শব্দটি যুক্ত হয়েছে এবং এই নামেই তিনি ইতিহাসে অধিক পরিচিতি লাভ করেন।

৯ম শতাব্দীর খ্যাতনামা এই মুসলিম বিজ্ঞানী ছিলেন তৎকালীন ইসলামী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদের গবেষণা সংস্থা বাইতুল হিকমার পরিচালক। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল এবং মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যার গবেষণায় তিনি মৌলিক অবদান রাখেন।

তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে প্রভাবশালী একটি গ্রন্থ হচ্ছে ‘কিতাব আল-হিসাব আল-হিন্দ’ (ভারতীয় গণনা সংক্রান্ত গ্রন্থ)। তিনশত বছর পর এই বইটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয় এবং আরবি থেকে ল্যাটিন ভাষায় এটি অনুবাদ করা হয়।

এই গ্রন্থটি ইউরোপের সাথে গণনার জন্য ব্যবহৃত ভারতীয়-আরবীয় সংখ্যার পরিচয় করিয়ে দেয়। গণনার এই সংখ্যাগুলো পরবর্তীতে তৎকালীন ইউরোপে প্রচলিত গণনার জন্য ব্যবহৃত জটিল রোমান সংখ্যাসমূহের স্থান দখল করে নেয়। আল-খাওয়ারেজমির গ্রন্থে আলোচিত দশমিক পদ্ধতির ভারতীয়-আরবীয় এই সংখ্যাগুলোই আমরা বর্তমানে ব্যবহার করছি।

গ্রন্থটি অনুবাদের সময় আল-খাওয়ারেজমির নাম আরবি থেকে পরিবর্তিত করে ল্যাটিন অক্ষরে লেখার সময় ‘আলগোরিথমি’তে (Algoritmi) পরিবর্তিত হয়ে যায়। অ্যালগরিদম শব্দটির উৎপত্তি এই ল্যাটিন আলগরিথমি শব্দ থেকে।

বীজগণিত তথা অ্যালজেবরা (Algebra) শব্দটির জন্যও আমরা আলখাওয়ারেজমির নিকট ঋণী। আল-খাওয়ারেজমির বীজগণিত সংক্রান্ত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জাবির ওয়াল মুকাবালা’ গ্রন্থের আল-জাবের শব্দ থেকে অ্যালজেবরা নামটির উৎপত্তি।

গণিতচর্চায় তার গ্রন্থসমূহ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। তিনিই প্রথম দেখান, গণিতের জটিল জটিল সমস্যাগুলো কি করে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা যায়। মধ্যযুগে ল্যাটিন ভাষায় ‘অ্যালগরিসমাস’ (Algorismus) দশমিক গণনাপদ্ধতিকে বোঝানো হত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে শব্দটি ইংরেজিতে প্রবেশ করে এবং ইংরেজি সাহিত্যের প্রাচীনতম কবি জিউফ্রে চসার শব্দটি তার কবিতায় ব্যবহার করেন।

কিন্তু কোন সমস্যা সমাধান নির্দেশের ক্ষেত্রে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির ব্যবহার চালু হতে হতে উনাবিংশ শতাব্দী পার হয়ে যায়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ব্রিটিশ গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালেন ট্যুরিং তত্ত্বগতভাবে গবেষণা করেন, কি করে একটি যন্ত্র অ্যালগরিদমের নির্দেশনা অনুসরণ করে জটিলতর গণিতের হিসাব সম্পন্ন করতে পারে। এটি মূলত কম্পিউটার যুগের সূচনার সময়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ট্যুরিং ‘বোম্ব’ (Bombe) নামে একটি তড়িৎ-চুম্বকীয় যন্ত্র তৈরি করেন, যা অক্ষশক্তির পারস্পারিক যোগাযোগের জন্য সাংকেতিক ভাষা ‘অ্যানিগমা কোড’ (Enigma Code) এর অর্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহৃত হত।

বর্তমানে অ্যালগরিদম সাধারনভাবে ব্যবহৃত একটি পরিভাষা, যা অনেকসময় আমরা অসচেতনভাবেই ব্যবহার করি। কোন কাজের প্রণালী, ইন্টারনেটে কোন বস্তুর অনুসন্ধান, কোন বস্তু ক্রয় করার সুপারিশ এমনকি আমরা কিভাবে ভোট দেব এবং কিভাবে প্রেমে পড়বো, তার ভবিষ্যদ্বাণী করাকে নির্দেশ করতেও আমরা অ্যালগরিদম শব্দটি ব্যবহার করি।

মধ্যযুগের পারস্যে উদ্ভাবিত এই শব্দটি বর্তমানে এমন এক শক্তিশালী পরিভাষায় নিজেকে পরিণত করেছে যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি আমাদের ভাষায় প্রভাব ফেলছে।