পারিবারিক সমস্যার সঙ্গে কীভাবে লড়তে বলে ইসলাম?

কোনোরকম অশান্তি বা নূন্যতম সমস্যাও নেই এমন একটা পরিবার খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। আমাদের প্রত্যেকের পরিবারেই এমন কিছু ছোটোখাটো সমস্যা থাকে যা প্রিয়জনদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। জীবনের পথে এই ধরনের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না, এই সমস্যাগুলিকে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেই চলতে হয় আমাদের। আমরা অনেকেই মনে করি যে, “শুধু আমার সাথেই কেন হচ্ছে!” কিন্তু সত্যিটা হলো যে, শুধু আপনি নয় মহান মানুষ আলেম-উলেমারা প্রত্যেকেই এই ঘটনার শিকার হয়েছেন। আজ তাদেরই গল্প শোনাবো আপনাদের।

ইব্রাহিম (আঃ)-কে তাঁর নিজ পিতা অপমান করেছিলেন ও তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন। নিজের বাবার কাছে এহেন আচরণ কল্পনারও অতীত।

সেই দুই ভাই কাবিল ও হাবিলের কথা মনে আছে? কাবিল তার ভাই হাবিলের প্রতি এতটাই ঈর্ষাণ্বিত হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত তাকে খুন করে ফেলে। এই দুই ভাই ছিল আমাদের সকলের মাতাপিতা আদম ও হাওয়ার পুত্র। কখনও পিতা হিসেবে ভেবে দেখেছেন নিজের পুত্র অন্য সন্তানের ঘাতক।

ইউসুফের ভাইয়েরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করেছিল তাকে সারাজীবনের জন্য সড়িয়ে দেবার। কিন্তু তারপরে তার বাবা ইয়াকুব দুঃখে শোকে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক বছর পর যখন ইউসুফ ফিরে এলেন তখন তাঁর প্রত্যেকটি ভাই নিজের ভুল স্বীকার করে।

মুসা নিজের ভাই হারুণের প্রতি ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। কারণ হারুনের সামনে তিনি একটা বাছুরের উপাসনা হতে দেখেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি এতটাই রেগে যান যে তাঁর ভাইয়ের চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে যান (সূরা আল আয়াত, ১৫০-১৫১)

ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী সারা এবং জাকারিয়া ও তাঁর স্ত্রীর সন্তানধারণে অসমর্থ হন। একই সাথে ফিরওয়ানের স্ত্রী মুসাকে দত্তক নেন যখন তিনি সন্তানের জন্ম দিতে ব্যর্থ হন।

মরিয়াম তাঁর পুত্র ইসাকে কোনোরকম সাহায্য ছাড়া একাই জন্ম দেন ও বড় করেন। যা এখনের মতো তখনও ছিল কলঙ্কময় একটি ঘটনা। 

এনাদের সবার উপরে আর একজন মানুষ আছেন যিনি জীবনভর বহু কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, হারিয়েছেন বহু প্রিয়জনকে। সেই মুহম্মদ (সাঃ) প্রথমেই হারিয়েছিলেন চাচা আবু তালিবকে। এর পর নিজের অনেক ছেলেমেয়েকে শিশু অবস্থায় হারিয়েছেন। তারপর হারিয়েছিলেন নিজের আদরের স্ত্রী খাদিজাকে, তাঁর মৃত্যু মহান নবী (সাঃ)কে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল।

তাই এই সমস্ত সমস্যাকে অতিক্রম করে এঁরা পৌঁছেছিলেন চূড়ান্ত লক্ষ্যে। আমাদেরও এই পথই অনুসরণ করতে হবে সর্বোচ্চ স্তরে যাওয়ার জন্য। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলের রক্ষাকর্তা তিনি জানেন আমাদের কার কতটা প্রয়োজন এবং কতটা সহ্যক্ষমতা। আমাদের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য তখনই সফল হবে, যখন প্রতিশোধ নয় বা মুখোমুখি তর্কে না গিয়ে আমরা ক্ষমার রাস্তায় হাঁটবো। পারিবারিক সমস্যা, বাগ বিতণ্ডা আমাদের কাছে পরীক্ষা স্বরূপ। পরীক্ষা শুধু আমরা দিচ্ছি না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা বিজ্ঞাপনে সদাহস্য পরিবারের ছবি আমরা দেখে থাকি। মনে মনে সেরূপ পরিবারের কল্পনায় মন আঁকে। আমরা বলছি না, ছবিগুলি সবসময় সত্যি হয় না। কিছু ক্ষেত্রে হয়, কিছু ক্ষেত্রে নয়। কিন্তু আপনার পরিবারে সমস্যা এলে আপনি তা কীভাবে সামলাবেন, দৃঢ় চিত্তে তা মেনে নেবেন, বিষন্নতাকে গ্রাস করতে দেবেন, না অত্যন্ত কঠোর আচরণ করবেন, সেটা কিন্তু একমাত্র আপনি ঠিক করতে পারবেন।    

তাছাড়া এই বাধাবিপত্তি গুলোকে দুর্ঘটনা বা অশুভ সংকেত হিসাবে না দেখে আমরা এর মধ্যে থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারি। কারণ প্রতিটি বিপত্তি নতুন কোনো সম্ভবনা নিয়ে আসে আমাদের শিখিয়ে যায় নতুন কিছু। তাই মহান আল্লাহতায়ালার উপর ভরসা রেখে জীবনের পথে এগিয়ে যান, সমস্যা অনেক আসবে তবে পিছিয়ে গেলে চলবে না।