SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

পার্ট টাইম কাজ: কীভাবে সামলাবেন ব্যক্তিগত জীবন ও কেরিয়ার?

অর্থনীতি ১৩ জানু. ২০২১
মতামত
পার্ট টাইম কাজ
© Artur Szczybylo | Dreamstime.com

পার্ট টাইম কাজের কথা উঠলেই বন্ধুরা বলতে থাকে, তোর তো সুখের জীবন। দশটা পাঁচটার অফিস যাওয়া নেই। নিয়মিত বসের কাছে কথা শোনা নেই। ক্লায়েন্টের সঙ্গে সুমধুর ব্যবহার আর দিনের মধ্যে যেকোনো একটা সময় কাজ করতে বসা। ইচ্ছে হলে সকালে কাজ না করে বাড়ির লোকের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বিকেলে কাজ করতে বসতে পারিস, কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমি শুনে হাসি, আর ভাবি সত্যি, মানুষের কতরকম ধারণা থাকে।

পার্ট টাইম কাজে নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য

আসলে, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই পার্ট টাইম বা আংশিক সময়ের চাকরি মানেই আরাম। তারা মনে করে দিনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ একজন পার্ট টাইমার চাকুরীজীবীর কাছে থাকে। সে নিজের ইচ্ছে মত কাজ করে। তার জীবনে সপ্তাহের মাঝের চাপ, ব্যস্ততা ইত্যাদি খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এই ধারণাটি কিন্তু সর্বৈব ভুল!

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পার্ট টাইম কাজ আপনাকে ফুল টাইম কাজের থেকে অনেক বেশি স্ট্রেস ও দুশ্চিন্তা দিতে পারে। এমনকি, কখনও কখনও একজন ফুল টাইম ওয়র্কারের থেকে একজন পার্ট টাইম ওয়ার্কার অনেক বেশি কাজ করে, বলা ভাল করতে বাধ্য হয়।

এছাড়াও, যেহেতু বাড়িতে বসে কাজ তাই বেশিরভাগ সময় বাড়ির কাজের সঙ্গে- সঙ্গে প্রফেশনাল কাজ সামলাতে হয়। কেউ কেউ আবার চাকরির সঙ্গে পড়াশুনোও করেন। একজন পার্ট টাইম ওয়ার্কারের পক্ষে বাড়ির কাজ বা পড়াশুনো সামলে প্রফেশনাল কাজটি সামলানোও অনেকসময় জটিল হয়ে যায়। সেই সমস্ত জটিলতা কাটিয়েই তাঁকে ক্লায়েন্টের কাছে কাজ জমা দিতে হয়।

সেভাবে দেখতে গেলে, একজন পার্ট টাইম ওয়ার্কার আসলে মাল্টি টাস্ক করতে বাধ্য হয়। আর কে না জানে, মাল্টি টাস্কিং আসলেই কতটা মানসিক ভাবে ক্লান্তিকর।

এলেন আরনেস্ট কোসেক ও সুজান ল্যামবার্ট তাঁদের বই ‘ওয়র্ক অ্যান্ড লাইফ ইন্টিগ্রেশনঃ অরগানাইজেশনাল, কালচারাল অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল পার্স্পেক্টিভস’ -এ এই বিষয়ে বিশদে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের মতে, পড়াশুনোর সঙ্গে বা এমনিই পার্ট টাইম কাজ করার জন্য একটি বিশেষ মানসিক পরিবর্তন ও গঠনের প্রয়োজন হয়। আর সেই মানসিক পরিবর্তন শুধু ওয়ার্কারের ক্ষেত্রেই নয়, তার বাড়ির লোক, তার কাছে মানুষ এমনকি কোনো ক্ষেত্রে তার নিয়োগকর্তা বা ক্লায়েন্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সকলকেই আগে বুঝতে হবে পার্ট টাইম ওয়ার্ক শুনতে যতটা সহজ লাগে, বাস্তবে বিষয়টি একেবারে বিপরীত।

সুতরাং, এক্ষেত্রে নিজেকে সময় ও স্পেস দেওয়া ভীষণ ভাবে প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন ভূমিকায় একজন কতটা নিজেকে নিয়োগ করবে, সেই বিষয়েও খেয়াল রাখা।

বর্তমানে পার্ট টাইম ওয়ার্কিং বা ফ্রিল্যান্সিং-এর চাহিদা তুঙ্গে। একটা ল্যাপটপ আর একটা ঠিকঠাক ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে সহজেই ফ্রিল্যান্সিং এ অংশগ্রহণ করা যায়। কিন্তু, যেহেতু বিষয়টি সহজ নয় তাই পার্ট টাইম ওয়ার্কারদের জন্য রইল কিছু টিপস-

পার্ট টাইম কাজ ও অন্যান্য বিষয় একেবারে আলাদা করে ফেলুন

১। একজন ফ্রিল্যান্সার বা পার্ট টাইম কাজের জন্য সবার আগে প্রয়োজন তার নিজের ওয়ার্ক স্টেশন বা ওয়ার্ক প্লেস। বাড়ির মধ্যে একটি জায়গা নিজর ওয়ার্কস্পেস বানান। খুব ভাল হয় সেটি যদি আপনার পড়ার ঘর, লাইব্রেরি বা নিরবিলি কোনও ঘর হয় যেখানে আপনি মনোযোগ সহকারে আপনার প্রফেশনাল দুনিয়া সামলাতে পারবেন।

২। বাড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে বোঝান যে আপনি যদিও অফিসে যান না, তাও আপনার কাজটি কত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, যখন তখন বাড়ির কাজে আপনাকে ডাকলে আপনি অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। আপনি যখন আপনার ওয়ার্কস্পেসে আছেন তখন আপনি প্রফেশনাল কাজ সামলাচ্ছেন। সেই সময়টি অফিসে থাকারই সমান।

৩। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কাজ শেষ হলে আপনি যখন ওয়ার্কস্পেস থেকে বেরোবেন তখন যেন কোনও প্রফেশনাল চিন্তা আপনার মাথায় না থাকে। মনে রাখবেন, যেমন বলা হয় অফিসের কথা অফিসেই ছেড়ে আসতে, তেমন যেন আপনি আপনার প্রফেশনাল কাজের কথা ঐ ঘরেই ছেড়ে আসবেন। প্রফেশনাল আর পার্সোনাল স্পেস মিশে গেলে কিন্তু অন্তরঙ্গ সম্পর্কে টানাপোড়েন আসবে।

৪। ওয়ার্কস্পেস থেকে বেরিয়ে আসার পর কাজ সংক্রান্ত ফোন, মেল বা মেসেজের উত্তর দেওয়া একেবারেই উচিত নয়। মনে রাখবেন, নিজের প্রফেশনাল জীবনের বাইরেও একটা জীবন রয়েছে। সেটায় নজর দেওয়ার চেষ্টা করুন।

৫। ঘরের সমস্তকিছু সঠিকভাবে সামলে চলার চেষ্টা করুন, ঠিক যেভাবে আপনি আপনার কেরিয়ারের সবকিছু সামলে চলেন। দেখবেন, দুদিক থেকেই পজিটিভ ভাইব আপনাকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।

পার্ট টাইম কাজে টাইম ম্যানেজমেন্ট

ফ্রিল্যান্সিং বা পার্ট টাইম ওয়ার্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নানা রকম কাজ করার জন্য তৈরি থাকতে হয়। সাধারণত একজন ফুল টাইম ওয়ার্কার একটি ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করে, কিন্তু পার্ট টাইমারদের হতে হয় ভার্সেটাইল। এই জন্য টাইম ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারটি অত্যনত গুরুত্বপূর্ণ।

১। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ঘুমের রুটিন সঠিক হলে আপনি সুস্থ ভাবে ও সহজেই নিজের কাজ সামলাতে পারবেন। আমাদের প্রিয় নবী রাসুল(সাঃ) তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার পক্ষপাতী ছিলেন। সখর গামেদি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য দিনের শুরু বরকতময় করুন।’

অন্য একটি হাদিসে প্রিয় নবী (সাঃ) ইরশাদ করেন, ভোরবেলায় রিজিকের অন্বেষণ করো! কেননা সকালবেলা বরকতময় ও সফলতা অর্জনের জন্য উপযুক্ত সময়। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ৬২২০)

২। ছোট ছোট কাজগুলো আগের রাতে প্ল্যান করে রাখুন। এতে সহজে কাজ শুরু করতে পারবেন।

৩। পরের দিনের কী কী কাজ তা যদি আগের দিন একটি খাতায় বা নোটপ্যাডে টু ডু লিস্ট করে রাখেন তাহলে খুব সহজে কাজ শুরু ও শেষ করতে পারবেন। সময় নষ্ট একেবারেই হবে না।

৪। একমনা হয়ে কাজ করুন। মাল্টি টাস্কিং মানসিক ক্লান্তির সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে এতে মনোযোগ নষ্ট হয়। সুতরাং, একবারে একটি কাজ সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, একসঙ্গে অনেক কাজ করা তখনই সফল হয় যখন কাজগুলি একই রকমের হয়। অথবা, যে কাজ গুলিতে বিশেষ মনোযোগ লাগে না। তাই, সময় বাঁচানো মানে মাল্টি টাস্কিং এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন।

৫। অলস হবেন না। আপনার হাতে সময় আছে, তাই আপনি দেরি করে কাজ শুরু করলেন। কিংবা অনেক সময় নিয়ে কাজ করলেন। এতে কিন্তু আপনার কাজের মানই পড়ে যাবে। মনে রাখবেন, কোনও কাজ ছোট নয়। তাই সমস্ত কাজ খুব যত্ন নিয়ে মনোযোগ ও দায়িত্ব সহকারে করতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিং বা পার্ট টাইম কাজে নিয়মানুবর্তিতা

১। প্রতিদিনের কাজের তালিকা বানানোর সময় বাস্তববোধ সম্পন্ন তালিকা বানান। একসঙ্গে অনেক কাজ লিখবেন না। নিজের সীমাবদ্ধতা জানুন এবং সেই অনুসারে প্রতিদিনের কাজের প্ল্যান বানান।

২। নিজের উপর খুব কঠোর হবেন না। আপনার রুটিন যেন নিয়মিত কিন্তু ফ্লেক্সিবল হয়। ধরুন একটি কাজ আপনি সোমবার শেষ করবেন ভেবেছিলেন, সেটি যদি মঙ্গলবার বা বুধবার হয়ে যায় শেষ হতে তাহলে সেটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। আসল লক্ষ্য সঠিকভাবে কাজ শেষ করা। তার জন্য এক দুদিন বেশি সময় লাগলে সেটি গ্রহণযোগ্য সবক্ষেত্রেই।

৩। নিজের কাজের গুণগত মানের খেয়াল রাখুন। একই রকম কাজ করে যাবেন না। আমি প্রতি সপ্তাহে নিজের কাজগুলি আবার দেখি, ভুল গুলো নতুন করে বোঝার চেষ্টা করি। যে সপ্তাহে মনে হয় আমার কাজের ঠিকঠাক উন্নতি হয়েছে, সেই সপ্তাহে আমি নিজেকে পুরস্কার দিই। আর যে সপ্তাহে মনে হয় আমি আলস্য দেখিয়েছি বা দায়সারা কাজ করেছি, নিজের আত্মসমালোচনা করি। আত্মসমালোচনা সবসময় এই ক্ষেত্রে খুব কাজে আসে।

৪। আপনার হাতে রয়েছে আমার সারাদিনের নিয়ন্ত্রণ, তার মানেই যে আমি যতখুশি নিজেকে সময় দেব তা নয়। দিনের সঠিক ব্যবহার না করলে, অলস ভাবে দিন কাটালে আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তির উপর তার প্রভাব পড়ে। আমাদের উন্নতির পথ ব্যাহত হয়। এটা মাথায় রাখা ভাল, প্রত্যেকটা কাজ থেকে আমরা কিছু না কিছু শিখি। আর প্রতিদিনের কাজের মাধ্যমে এই শেখা যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আমাদের অবস্থা হবে বদ্ধ জলাশয়ের মতো। একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্সের মাধ্যমে আমরা ফ্রিল্যান্সাররা নিজেদের জীবন করে তুলতে পারি আনন্দময়।