SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

পালংশাকের উপকারিতা রয়েছে হাড় ও দাঁতের ক্ষেত্রে

স্বাস্থ্য ২০ জানু. ২০২১
জানা-অজানা
পালংশাকের
© Dlecic | Dreamstime.com

পালংশাক শীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শাক। শীতে পালংশাকের ঝোল খেতে যেমন উপাদেয়, তেমনই ভাল লাগে পালংশাক দিয়ে তৈরি নানারকম আমিষ বা নিরামিষ রান্নাও। কেউ-কেউ আবার পালংশাক দিয়ে নানারকম উপাদেয়, পুষ্টিকর স্যালাড, সুপ, এনার্জি ড্রিঙ্কও খেয়ে থাকেন। ডাক্তাররা একে ‘সুপারফুড’ নাম দিয়েছেন। বিভিন্ন রোগের থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারেরা যে-সমস্ত সবুজ শাকসবজি খেতে বলেন, তার মধ্যে পালংশাক অন্যতম। এর বৈজ্ঞানিক নাম স্পিনাশিয়া ওলেরেসিয়া।

কবে থেকে এল পালংশাক?

পালংশাকের উৎপত্তির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, প্রায় ২০০০ বছর আগে প্রাচীন পারস্য অর্থাৎ আজকের ইরানে পালংশাক খাওয়ার প্রচলন ছিল। এরপর বণিকদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশ হয়ে পালংশাক ‘পারস্যের সবজি’ হিসেবে চিনে প্রবেশ করে। এর কয়েক শতক পর সিসিলিতে পালংশাক খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। এর নানা উপকারিতার জন্য সেইসময় থেকেই এই সবুজ শাকটি আরবের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খ্রিস্টিয় দশম শতকে পারস্যের বিখ্যাত মনীষী আল-রাজির লেখায় এর কথা জানা যায়। দ্বাদশ শতকের আরবি কৃষিবিদ মনীষী ইবন আল-আওয়ামের লেখাতেও ‘রইস আল-বুকুল’ বা ‘সবুজ শাকের রাজা’ হিসেবে পালংশাকের নাম পাওয়া যায়।

পালংশাকের উপকারিতা

পালংশাকের উপকারিতা প্রচুর। কাঁচা পালংশাকে ৯১% জল, ৪% কার্বোহাইড্রেট, ৩% প্রোটিন থাকে। প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ছাড়াও এতে থাকে ভিটামিন এ, বি২, বি৬, সি, ই, কে, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, সোডিয়াম, ফসফরাস, যা আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পুষ্টি উপাদানের প্রায় ২০%-এর যোগান দেয়। একারণে ডাক্তাররা আমাদের পালংশাক খেতে বলে থাকেন। এখন আমরা দেখব পালংশাকের কী কী উপকারিতার জন্য একে আপনি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।

পালংশাক ক্যানসার প্রতিরোধ করে

পালংশাকে প্রচুর পরিমাণে জিয়াজ্যান্থিন ও ক্যারোটিনয়েড থাকে যা আমাদের দেহকে ফ্রি র‍্যাডিক্যাল মুক্ত করে। এই ফ্রি র‍্যাডিক্যাল কার্যত আমাদের শরীরে ক্যানসার সহ নানা ক্ষতিকর রোগ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পালংশাক পেট, মুখ, ইসোফেগাসের ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

শর্করার পরিমাণ কমায়

পালংশাকে থাকা পটাশিয়াম রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। পটাশিয়াম রক্তে সোডিয়ামের প্রভাবকে হ্রাস করে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে উচ্চ ডায়াবেটিস যুক্ত ব্যক্তিরা পালংশাক খেলে উপকার পেতে পারেন।

চোখের পক্ষে উপকারী

পালংশাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ রয়েছে যা চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি ঠিক রাখার জন্য চোখের মিউকাস মেমব্রেনকে সুস্থ রাখে। এছাড়া এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন চোখের দৃষ্টি ভাল রাখতে সাহায্য করে ও ছানি, বয়সজনিত নানা সমস্যা ইত্যাদি থেকে চোখকে রক্ষা করে।

পালংশাক রক্তচাপ কমায়

বর্তমান জীবনযাপন প্রণালী, খাদ্যাভ্যাস, স্ট্রেসের কারণে বেশিরভাগ মানুষ উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন যা কিডনির সমস্যা, হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং স্ট্রোকের কারণ। পালংশাক উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমিয়ে আমাদের মনকে শান্ত রাখে। এতে থাকা ভিটামিন সি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। পালংশাকে থাকা লুটেইন ধমনীর প্রাচীরের স্থূলত্ব কমায়, ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

হাড় ভাল রাখে

পালংশাকে থাকা ভিটামিন-কে হাড়কে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, শরীরে ক্যালশিয়াম শোষণ বৃদ্ধি করে। এক কাপ পালংশাকে প্রায় ২৫০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম থাকে, যা আমাদের হাড় ও দাঁতের জন্য অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে মহিলারা বেশিরভাগ হাড়ের ব্যথায় ভোগেন, তাঁরা পালংশাক খেলে উপকার পেতে পারেন।

পালংশাকের অন্যান্য উপকার

যারা ওজন কমাবেন বলে ভাবছেন, তাঁরা খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পালংশাক রাখলে উপকার পাবেন। এতে থাকা ফাইবার হজমক্ষমতা বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। আপনার যদি মাইগ্রেন, আরথ্রাইটিস, মাথা ব্যথার সমস্যা থাকে, তাহলেও পালংশাল নিয়ম করে খেতে পারেন। এতে থাকা আয়রন রক্তাল্পতা দূর করে। এটি শরীরে রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ত্বককে উজ্জ্বল রাখতেও পালংশাকের জুড়ি নেই।

পালংশাকের অপকারিতা

তবে এত উপকারিতার পাশাপাশি পালংশাকের বেশ কিছু অপকারিতাও রয়েছে। পালংশাক খাওয়ার আগে সেগুলি আমাদের জেনে নেওয়া প্রয়োজন। যে-কোনও জিনিসই পরিমাণ বুঝে খাওয়া উচিত। পালংশাকও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণে পালংশাক খেলে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হয়।

কিডনিতে পাথরের সম্ভাবনা বাড়ে

পালংশাকে থাকে অক্সালেট, যা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। মূত্রে অক্সালেটের আধিক্যের কারণে কিডনিতে এই পাথর তৈরি হয়। জেনে রাখা ভাল, ১০০ গ্রাম পালংশাকে ৯৭২ মিলিগ্রাম অক্সালেট থাকে। তবে পালংশাক খাওয়ার আগে ফুটিয়ে নিলে অক্সালেটের পরিমাণ খানিক কমে। তাছাড়া ক্যালশিয়াম যুক্ত অন্য কোনও খাবার, যেমন দই বা পনিরের সঙ্গে পালংশাক খেলে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। এছাড়া এতে থাকা পিউরিন পরে ইউরিক অ্যাসিডে পরিণত হয়, যা কিডনির পক্ষে ক্ষতিকর।

হৃদযন্ত্রের সমস্যা বাড়ায়

আমাদের রক্তে ওয়ারফ্যারিন নামে একধরনের উপাদান থাকে, যা রক্তকে জমাট বাঁধা থেকে আটকায় ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করে। পালংশাকে থাকা ভিটামিন কে ওয়ারফ্যারিনের কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেয়। ফলে যারা রক্তচাপ বা হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের পক্ষে পালংশাক বুঝেশুনে খাওয়াই শ্রেয়।

খনিজ উপাদানের শোষণ ক্ষমতা হ্রাস

কিছু গবেষণায় জানা গিয়েছে, পালংশাকে থাকা অক্সালেট আমাদের শরীরে খনিজ উপাদানের শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অধিক পরিমাণে পালংশাক খেলে তা শরীরে ক্যালশিয়ামের শোষণ হ্রাস করে। তবে দুধের সঙ্গে খেলে কোনও সমস্যা তৈরি হয় না। এছাড়া পালংশাকে থাকা অক্সালেট আয়রনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্রিস্টাল তৈরি করে যা আয়রনের শোষণ আটকে দেয়। ফলে অ্যানিমিয়া দেখা যায়। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতাকে পালংশাকে উপস্থিত গয়ট্রোজেন নামক উপাদান প্রতিহত করে, যদিও এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে এখনও আসা যায়নি। তবে থাইরয়েড থাকলে পালংশাক এড়িয়ে চলাই ভাল।

গেঁটে বাত বাড়ায়

পালংশাকে পিউরিন বলে একধরনের রাসায়নিক উপাদান থাকে যা গেঁটে বাতের কারণ। যদিও এইসম্পর্কে এখনও যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সাধারণভাবে ডাক্তাররা গেঁটে বাত থাকলে পালংশাক নিয়ন্ত্রিতভাবে খাওয়ার পরামর্শ দেন।

অন্যান্য অপকার

অত্যধিক পালংশাক খেলে ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে অনেকসময় রক্তে শর্করার পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, আবার কখনও-কখনও রক্তে শর্করা বেশি পরিমাণে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একারণে অপারেশনের ২ সপ্তাহ আগে থেকে ডায়াবেটিস জনিত জটিলতা এড়াতে জন্য পালংশাক খাওয়া বন্ধ করা উচিত। পালংশাকে অত্যধিক পরিমাণে ফাইবার থাকে। ফলে বেশি পরিমাণে পালংশাক খেলে তা অপকার করে। অনেকসময় এর ফলে গ্যাস, পেটে চাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। আবার খাদ্যে অত্যধিক ফাইবারের উপস্থিতি ডায়েরিয়ারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে থাকা অক্সালিক অ্যাসিড অতিরিক্ত পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলে খনিজ উপাদান শোষণে বাধা সৃষ্টি করে। অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে পালংশাক থেকে কিন্তু অ্যালার্জিও হতে পারে।

পালংশাকের উপকারিতা একাধিক, তবে এর অপকারি ও ক্ষতিকর দিকগুলিও মাথায় রাখা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, প্রয়োজনের তুলনায় অত্যধিক খেলে পালংশাক কিন্তু আপনার উপকারের বদলে অপকারই বেশি করবে। তাই খাদ্যতালিকায় পালংশাকের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। প্রয়োজন বুঝলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই ভাল।