পাহাড়ের গুহায় আটকা পড়ে তিনজন যুবকের গল্প থেকে কী শিক্ষা পাই?

ID 184277838 © Chernetskaya | Dreamstime.com

হাদিসে বর্ণিত ঘটনা

বনি ইসরাইলের তিন জন যুবক ঘুরতে বের হয়ে বিপদে পড়ে যায়। তাঁরা তিন জনই ছিলেন আল্লাহর ইবাদতকারী মুখলিস বান্দা। তাঁরা তাঁদের আমলের ওসিলায় সে বিপদ থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন। হাদিস থেকে ঘটনাটি বর্ণনা হলো-

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ

“বনি ইসরাইলের তিনজন যুবক একদা পথ চলছিল। এমন সময় তারা বৃষ্টির মুখে পড়লো। অতঃপর বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে তাঁরা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহড়ের উপর থেকে বড় এক খণ্ড পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা নিজেদের কৃত কিছু নেক আমলের কথা চিন্তা করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে লাগলো।”

তাদের একজন বললো,

“হে আল্লাহ্‌! আমার পিতামাতা খুব বৃদ্ধ ছিলেন। আমার ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করে সন্তানদের আগে আমার পিতামাতাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরি হয়। বাড়িতে এসে দেখি পিতামাতা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি প্রতিদিনের মত দুধ দোহন করলাম। তারপর তাদেরকে না জাগিয়ে আমি তাদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদের আগে বাচ্চাদেরকে দুধ পান করানোও আমি সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল।

হে আল্লাহ্‌! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই।” তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।

দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো,

“হে আল্লাহ্‌! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে, আমি তাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ যিনা করতে চাইলাম)। কিন্তু সে তা অস্বীকার করে তার জন্য একশ দিনার নিয়ে আসার শর্ত দিল। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম। তখন সে বললো, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিও না (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।

হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন।” তখন পাথরটা আরও কিছুটা সরে গেল।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল,

“হে আল্লাহ্‌! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। সে তার কাজ শেষ করে আমাকে বললো, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম। এর দ্বারা অনেক গরু ও রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে এসে বললো, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরি দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বললো, আল্লাহকে ভয় কর। আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি তাকে সবকিছু খুলে বললাম। বললাম- আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ওইগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল।

হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকিটুকু সরিয়ে দিন।” তখন আল্লাহ পুরো পাথরটাকেই সরিয়ে দিলেন। (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ)

হাদিস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো হলো-

১। বান্দা সুখে-দুঃখে যেকোনো প্রয়োজনে সবসময় আল্লাহকে ডাকবে।

২। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ইবাদতই করা হোক না কেন, তাতে পরিপূর্ণ ইখলাস থাকা একান্ত আবশ্যক। একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত না করলে তাতে পরিপূর্ণ সফলতা সম্ভব নয়।

বনি ইসরাইলের এই তিন ব্যক্তির প্রতিটি কাজই ছিল আন্তরিক একনিষ্ঠতা। একনিষ্ঠ ইবাদতের ওসিলায় আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বিপদ থেকে মুক্ত করেছিলেন।

৩। পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে। স্ত্রী ও সন্তানদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৪। শ্রমিককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।

৫। সৎ আমলকে ওসিলা হিসাবে গ্রহণ করা যাবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিক দান করুন। দুনিয়া ও পরকালের সফলতা দান করুন। আমিন।