পিতামাতার মৃত্যুর পরেও কীভাবে তাঁদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো যায়

parents
ID 179554868 © Paulus Rusyanto | Dreamstime.com

ইসলাম ন্যায় ও করুণার ধর্ম; যা নৈতিকতার শিক্ষা দেয় এবং সমাজে খারাপ আচরণ নিষিদ্ধ করে।

প্রবীণদেরকে ইসলামে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; তাদের সাথে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে আচরণ করতে বলা হয়েছে। 

যদিও যে কোনো বয়সে মৃত্যু হতে পারে, তবে পিতামাতারা প্রায়শই প্রবীণ বয়সে উপনীত হন এবং এজন্য তাঁদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। যদিও বার্ধক্যের কারণে পিতামাতা অকারণে অধৈর্য্য বা ক্রোধান্বিত হতে পারেন, তবুও একজন মুসলিম হিসেবে তাদের প্রতি সদাচারী হতে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে। পিতামাতার সাথে উত্তম আচরণকে আল্লাহ তাঁর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে শরীক না করার সাথে উল্লেখ করেছেনঃ

“আর ইবাদত কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতামাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর…” (আল কুরআন ৪:৩৬)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে একজন সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, “আল্লাহ কোন কাজকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।” তিনি জবাব দিলেনঃ

“সময়মত নামাজ আদায় করা এবং পিতামাতার সাথে সৎ ব্যবহার করা…” (বুখারী)

অপর একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন, “ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক!” তখন সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কার কথা বলছেন?” জবাবে তিবি বললেন, “ঐ ব্যক্তি যে তার পিতামাতা দু’জনকে বা যেকোনো একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল কিন্তু তাদের খেদমত করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না” (মুসলিম)

উপকারী কিছু পন্থা

মৃত্যুর পরেও পিতামাতাকে সম্মান জানানোর অনেক পন্থা ইসলামে রয়েছে। সন্তান পিতামাতার মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করতে পারে; তাদের জন্য বদলি হজ্জ করতে পারে; আবার তাদের নামে দরিদ্রদেরকে আর্থিক সাহায্যও করতে পারে। এগুলিকে ইসলামী পরিভাষায় ‘ঈসালে সওয়াব’ বলা হয়।

পিতামাতার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখাও মৃত্যুর পরে পিতামাতাকে সম্মান জানানোর আরেকটি পন্থা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত বাকি সব বন্ধ হয়ে যায়ঃ সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম (যা সে কাউকে শিক্ষা দিয়েছে) এবং নেককার সন্তান যারা তার জন্য দু’আ করে।” (তিরমিযী)

একজন সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ

“পিতামাতার মৃত্যুর পরেও কি তাদের বাধ্যগত সন্তান হওয়ার কোনো উপায় আছে?” তিনি জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, চারটি উপায় আছেঃ তাদের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করো। তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো। তাদের বন্ধুদের সাথে সদয় আচরণ করো এবং তাদের নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো”। (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

সুতরাং বোঝা গেল, যে সন্তান জীবিত অবস্থায় পিতামাতার তেমন বাধ্যগত ছিল না, সে পিতামাতার মৃত্যুর পরেও তাদের বাধ্যগত হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম একজন ব্যক্তির কথা বলেছেন যিনি জান্নাতে নিজের মর্যাদা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, “আমি এই মর্যাদা কিভাবে পেলাম?” তাঁকে জানানো হয়েছে, “তোমার সন্তানের দু’আর বদৌলতে” (ইবনে মাজাহ)

জান্নাতের চাবি

একবিংশ শতাব্দীর জীবন খুবই ব্যাস্ততম; আর এই ব্যস্ততার মাঝে আমরা প্রায়শই ভুলে যায় যে, ইসলাম আমাদেরকে উত্তম আখলাক ও রীতিনীতির শিক্ষা দিয়েছে।

পিতামাতার প্রতি সদাচরণ একটি ফরজ দায়িত্ব। এক্ষেত্রে আমরা আমদের আকাবির ও সালাফদের জীবনে দেখতে পারি যে, তাঁরা পিতামাতার প্রতি কতটা সদাচারী ছিলেন। তাদের আচরণ থেকে প্রকৃতপক্ষেই এটা প্রতীয়মান হত যে, জান্নাতের চাবি মায়ের পায়ের নিচে।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিঃ এর আচরণ দেখুন। একদিন তিনি মক্কার পথে যাচ্ছিলেন। এমনসময় একজন বেদুঈনের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁর মাথার পাগড়ি খুলে বেদুঈন লোকটিকে বসতে দিলেন। তাঁর এই আচরণ দেখে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি এই বেদুঈনের সাথে এমন আচরণ করলেন!” তিনি উত্তরে বললেন, “এই লোকটির সাথে আমার পিতা উমরের খুব সখ্যতা ছিল আর আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “পিতাকে সম্মান করার একটি পন্থা হল তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন তাঁর বন্ধুদের সাথে উত্তম আচরণ করা হয়” 

ইসলাম পারিবারিক সম্প্রীতির গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বোঝে। আর এ কারণে পরিবারের সকলের সাথে বিশেষ করে পিতামাতার সাথে আচরণ কেমন হবে এ বিষয়ে কুরআন হাদিসে অনেক দিক নির্দেশনা আমরা দেখতে পাই। তাই আসুন এই দিকনির্দেশনার আলোকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ পরিবার গড়তে পিতামাতার সাথে যেমন আচরণ করতে ইসলাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে আমরা সেগুলি মেনে চলার চেষ্টা করি।