পিতার নিকট শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়ায় কন্যা সন্তান

edi-libedinsky-1bhp9zBPHVE-unsplash
Fotoğraf: Edi Libedinsky-Unsplash

মহান রাব্বুল আলামিন মানুষকে দুই ভাগে সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ এবং নারী। নারী জাতি মানব সমাজের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এক অতুলনীয় সৃষ্টি। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা কন্যা সন্তানকে অনেক মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছেন।

নারীরা সমাজের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহান রাব্বুল আলামিন যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান, আবার যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন। এই বিষয়ে পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “মহাকাশ ও পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্য আল্লাহর। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। যাকে ইচ্ছা পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে সন্তানহীন করে রাখেন। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সূরা শুরা, আয়াত ৪৯-৫০)।

ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগে কন্যা সন্তানদের সীমাহীন ভাবে অবহেলা করা হতো। এমনকি ওই সময়ে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। সমাজের ভয়ে, লজ্জার জন্য রাতের অন্ধকারে বাবা নিজেই তার কন্যা সন্তানকে হত্যা করত। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পরে রাসূল (সা.) কন্যা সন্তানকে হত্যা করা হারাম ঘোষণা করলেন। তিনি নারীদের মর্যাদা, গুরুত্ব এবং সম্মানের কথা পুরো সমাজের কাছে তুলে ধরলেন । নাবীত ইবনু শুরাইত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তির কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সেখানে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের পাঠান। তারা গিয়ে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, হে ঘরবাসী! তারা কন্যাটিকে তাদের ডানার ছায়ায় আবৃত করে নেয়, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং বলে একটি অবলা জীবন থেকে আরেকটি অবলা জীবন ভূমিষ্ঠ হয়েছে এবং তত্ত্বাবধানকারী কেয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। (মুজামুস সগীর- হা : ৭০)।

সেই আমলে কোন কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তা অপমানজনক হিসেবে গণ্য করা হতো। মহান আল্লাহতালা এর বর্ণনা করে পবিত্র কোরআন শরীফে বলেনঃ “ওদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের খবর দেয়া হয়, তখন ওদের মুখ কালো হয়ে যায়, অসহনীয় শোক ও মনস্তাপে ওদের অন্তর প্লাবিত হয়। কন্যাসন্তান হওয়ার গ্লানিতে লোকসমাজ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। ভাবতে থাকে, অপমান সহ্য করে সে ওকে লালন করবে, না জীবিত মাটিচাপা দেবে! ওহ! ওদের ফয়সালা কত না জঘন্য!” (সূরা আন-নহল, আয়াত ৫৮-৫৯)।

এ বিষয়ে রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে আরো বলেনঃ “অথচ ওদের অবস্থা হচ্ছে, দয়াময়ের সন্তান বলে ওরা যাদেরকে অভিহিত করে, সেই কন্যাদের জন্মের সংবাদ যদি ওদেরকে দেয়া হয়, তখন ওদের মুখ কালো হয়ে যায় এবং ওরা অসহনীয় চাপা ক্রোধে জর্জরিত হয়—কী! (আমার কন্যা হয়েছে) যাকে লালন করতে হবে স্রেফ অলংকার হিসেবে? তারপর সে ডুবে যায় এক অন্তর্দ্বন্দ্বে (অর্থাৎ মেরে ফেলবে, না লালন করবে)।” (সূরা জুখরুফ, আয়াত ১৭-১৮)।

কারো যদি কন্যা সন্তান জন্মের কারণে অসন্তুষ্ট হয় তবে তার জাহেলী স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক উপায় লালন পালন করলে জাহান্নাম ও তার পিতার মাঝে কন্যা দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে। ইমাম আহমাদ, বুখারী ও ইবনু মাজাহ্ ‘উক্ববাহ্ (রা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি,

‘যে ব্যক্তির তিন কন্যা হবে, আর সে তাতে ধৈর্য ধারণ করবে, তাদেরকে স্বীয় সামর্থ্য মোতাবেক পানাহার ও পরিধান করাবে, তবে তারা জাহান্নামের আগুন ও তার মধ্যে পর্দা হয়ে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হয়ে যাবে।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম আয়িশাহ (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার নিকট একটি নারী তার দু‘কন্যাসহ আসলো। সে আমার নিকট প্রার্থনা করল, কিন্তু সে আমার নিকট থেকে একটি খেজুর ব্যতীত আর কিছু পেল না। আমি তাকে তাই দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করে তার উভয় কন্যার মাঝে ভাগ করে দিলো, নিজে তা হতে কিছুই খেলো না। তারপর সে উঠে তার দুই মেয়ের সঙ্গে চলে গেল।

নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তিকে কন্যাদের মধ্য হতে কোনো ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে, আর সে এমতাবস্থায় তাদের সঙ্গে ইহসান করে, তবে তার জন্য (জাহান্নামের) আগুনের মাঝে তারা প্রতিবন্ধক হবে ‘ (সহিহ বুখারী- হা:৫৫৯৫)।

ইসলাম ধর্মে কন্যাসন্তানকে মহান রাব্বুল আলামীন অনেক মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন উত্তরাধিকার প্রাপ্ত সম্পদের অংশে কন্যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে । মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে এ বিষয়ে বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রাপ্তি) সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন : এক ছেলে পাবে দুই মেয়ের অংশের সমান, শুধু মেয়ে দুই-এর বেশি রেখে গেলে তারা পাবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর যদি এক মেয়ে থাকে তবে সে পাবে অর্ধেক। তার সন্তান থাকলে তার পিতামাতা প্রত্যেকেই সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ; সে নিঃসন্তান হলে যদি শুধু পিতামাতা তার উত্তরাধিকারী হয় তবে মা পাবে এক তৃতীয়াংশ; কিন্তু যদি তার ভাইয়েরা থাকে তবে তার মা পাবে এক ষষ্ঠাংশ; অবশ্য এ সবই হবে মৃত ব্যক্তির অসিয়তের দাবি পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কে তোমাদের বেশি আপন, তা তোমরা জানো না। এই হচ্ছে আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা: নিসা, আয়াত: ১১)।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর উপর ভরসা রেখে কন্যা সন্তানদের লালন পালন, সার্বিক তত্ত্বাবধান, হৃদয় উজার করে ভালোবাসা দিয়ে রাব্বুল আলামিনের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করতে হবে। এবং কন্যা সন্তানকে তার যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা এবং অধিকার প্রদান করতে হবে। রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে কবুল করুক।