পিতা পুত্রের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিৎ, ইসলাম কী বলে

dreamstime_s_111403449
sillhouette of happy asian family having fun time at the beach with sunset view as background. family concept

পিতা পুত্রের সম্পর্ক হবে অত্যন্ত মধুর। একজন বাবার অবদান অপরিসীম। বাবা সন্তানকে আগলে রাখে। নিজে কষ্ট করে হলেও বাচ্চাদের ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। একটা পরিবারে বাবাই প্রধান, ভরণপোষণ থেকে শুরু করে সবকিছুই বাবাকে করতে হয়।
কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) –এর কাহিনি উল্লেখ করে পিতা ও পুত্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সন্তানকে সবসময় আদর করে ডাকি না। তাদের উপরে সবকিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। অথচ কুরআন বলছে, নবী তার ছেলেকে সম্বোধন করলেন ‘প্রিয় বাছা’ বলে। আবার সন্তানও তার পিতাকে আদবের সাথে ভালোবাসার ডাকে ডাকতেন। পরিবার এমন জায়গা, যা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে মায়ার বাঁধনে। কখনও এই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে মানুষের শেকড়টাই যেন উপডড়ে যায়।
মহান আল্লাহ বলেন, আমি তো মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণের নির্দেশ দিয়েছি।

পিতা হলেন সন্তানের প্রথম অভিভাবক, প্রথম শিক্ষক। আর পরিবার তার প্রথম বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয় থেকে সে যা শিখবে, সেটার ওপর নির্ভর করবে তার ভবিষ্যত সুন্দর হওয়া না হওয়া। তাই এক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে হবে।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সন্তানকে লালন-পালন করা ঈমানের অন্যতম দাবী। পিতা-মাতার উপর সন্তানদের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করার প্রয়াস পেলাম।
১. কানে আযান দেওয়া : সন্তান দুনিয়াতে আসার পর গোসল দিয়ে পরিষ্কার করে তার ডান কানে আযান দেয়া এবং বাম কানে একামত দেয়া, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এটি পিতার উপর এজন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছে দেয়া এবং ওত পেতে থাকা শয়তান যেন তার কোন ক্ষতি করতে না পারে।
২. সুন্দর নাম রাখা : বাচ্চার জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা পিতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাম অর্থবহ হওয়া নামের সৌন্দর্য। কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক অসুন্দর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন।
৩. আক্বিকা করা : ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো সন্তানের আকীকা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সন্তান ছেলে হলে দুটি ছাগল দ্বারা আক্বীক্বা করবে।
৪. সদকা করা : ছেলে হলে সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকা করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতেমা বতুল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে ইরশাদ করেন, হে ফাতেমা ! তাঁর (হাসানের) মাথা মুন্ডন কর এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকা কর।
৫. খাতনা করা : ছেলেদের খাতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নাত। রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হাসান এবং হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার সপ্তম দিবসে খাতনা করিয়েছেন।
৬. কুরআনুল করিম শিক্ষা দান : ছোট বেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা, কুরআন শিক্ষা করা ফরয। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও। কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই।
৭. নামায শিক্ষা দেওয়া ও সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করা : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের নামাযের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে নামাযের জন্য মৃদু প্রহার কর এবং শোয়ার স্থানে ভিন্নতা আনো।
৮. আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া : সন্তানদের আচরণ শিক্ষা দেয়া পিতা-মাতার উপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তভুক্ত। হযরত লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানকে বললেন, আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। পরিবার থেকে সন্তানেরা আদব কায়দা শিখে থাকে।
৯.আদর-স্নেহ ও ভালবাসা দেওয়া : সন্তানদেরকে স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালবাসা প্রিয়নবীর সুন্নাত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন।
১০. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করা : সন্তানদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে। হযরত উম্মে সালামা রাদ্বিয়ল্লাহু আনহা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আবূ সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি, এতে কি আমার জন্য প্রতিদান রয়েছে? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যতদিন তুমি খরচ করবে ততদিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে।
১১. বিবাহ দেওয়া: সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তাকে বিবাহ দেয়া পিতার দায়িত্ব। সন্তান যখন যৌবনে পদার্পন করে তখন তার চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন ঘটে, তখন সে নতুন কিছুর সন্ধানে উন্মুখ হয়। সে যেকোন সময় বিপদগামী হতে পারে। তাই পিতার একান্ত উচিৎ উপযুক্ত পাত্র/পাত্রী নির্বাচন করে তাদের বিবাহের ব্যবস্থা করা। বিবাহ মানুষকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখে।
১২. দোয়া করা : পিতাকে সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে।
পরিশেষে বলা যায়, সন্তান দাম্পত্য জীবনের কাঙ্খিত ফসল। যাতে সৎ সন্তান হিসাবে তারা পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাদের জন্য আমল জারী থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩টি আমল বন্ধ হয় না-১. সদকায়ে জারিয়া ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দোয়া করে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর নির্দেশ মতো সন্তান মানুষ করার তাওফীক দান করুন। আমিন!