SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

পিরি রেইস: বিখ্যাত উসমানীয় মানচিত্রাঙ্করের অবদান ভোলেনি ইতিহাস

ইতিহাস ২১ জানু. ২০২১
জানা-অজানা
পিরি রেইস
© Steve Estvanik | Dreamstime.com

পিরি রেইস নামে পরিচিত আহমেদ মুহিদ্দীন পিরি (বা হাছি আহমেত মুহিত্তিন পিরি) মহান উসমানীয় সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল পদে আসীন ছিলেন। তাঁর আঁকা বিশ্বের মানচিত্রকেই প্রাচীনতম তুর্কি অ্যাটলাসের মর্যাদা প্রদান করা হয় যেখানে আধুনিক বিশ্বের সঠিক রূপ রয়েছে। পিরির আঁকা বিশ্বের মানচিত্রই হল সেই প্রাচীনতম মানচিত্র যেখানে আমেরিকার উপস্থিতি রয়েছে।

উসমানীয় আর্কাইভে পিরি রেইস-এর পরিচিতি

বহু বছর কেটে যাওয়ার পরেও পিরি রেইস সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায়নি, যত দিন না উসমানীয় আর্কাইভগুলির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। উসমানীয় সংরক্ষণাগার থেকে সংগৃহীত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, পিরি রেইসের পুরো নাম হাছি আহমেত মুহিত্তিন পিরি এবং তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ইউরোপীয় অংশের গেলিবোলুতে বা মধ্য আনাতোলিয়ায় অবস্থিত কারামানে, যেখানে ছিল তাঁর পিতাও জন্মেছিলেন। তাঁর সঠিক জন্ম তারিখ এখনও ধন্দ রয়েছে, তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা ১৪৬৫ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যেই কোনও এক সময় তাঁর জন্ম হয়েছিল।

পদাঙ্ক অনুসরণ

পিরি রেইস-এর  চাচা, কামাল রেইস ছিলেন একজন বিখ্যাত নাবিক ও জলদস্যু। ১৪৯৫ সালে তিনি সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল পদমর্যাদা লাভ করেন। ১৪৮১ সালে তাঁর চাচার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, পিরি রেইস-ও সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীতে কাজ করতে শুরু করেন, এবং এই সময় তিনি তাঁর মামার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য হল ১৪৯৯ সালের ‘জোঞ্চিওর যুদ্ধ’ এবং ১৫০০ সালে ‘মোডোনের যুদ্ধ’। ১৫১১ সালে মিশর অভিমুখে যাত্রা করার সময় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঝড়ের কবলে পড়ে কামাল রেইসের জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায় এবং এই ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। চাচা কামালের মৃত্যুর পরে পিরি রেইসের জীবন অন্য খাতে বইতে শুরু করে। তিনি গেলিবোলুতে ফিরে যান এবং নৌচালনা সম্পর্কিত পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন।

মানচিত্রের উপকথা

গেলিবোলুতে ফিরে এসে নৌচালনা সম্পর্কিত পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার সময়ে, ৯১৯ মহরমে (৯ মার্চ-৭ এপ্রিল ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দ) পিরি রেইস তাঁর প্রথম বিশ্বের মানচিত্রটি এঁকেছিলেন। এই মানচিত্রে কর্কটক্রান্তি রেখার অক্ষাংশে সাহারাকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বকে আঁকা হয়েছিল। বর্তমানে এই মানচিত্রের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ উপস্থিত রয়েছে এবং বাকিটি এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর্কাইভ থেকে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে, পিরি রেইস ২০টি সোর্স মানচিত্র ব্যবহার করেছিলেন যার মধ্যে ৮টি টলেমাইক, ৪টি পর্তুগীজ এবং একটি আরবী মানচিত্র ছিল। এর মধ্যে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আঁকা একটি মানচিত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৫০১ সালে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া উপকূলে সাতটি জাহাজ দখল করার সময় এই মানচিত্রটি কমল রেইস পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

তাঁর আঁকা বিশ্বের প্রথম মানচিত্রটি ১৯২৯ সালে জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ গুস্তভ অ্যাডল্ফ ডেইসমান আবিষ্কার করেছিলেন ইস্তাম্বুলের টপকাপি প্রাসাদে। এই মানচিত্রটি ১৫১৭ সালে কায়রোর সুলতান প্রথম সেলিম-এর কাছেও উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই উসমানীয় মানচিত্রে প্রথম আমেরিকার অস্তিত্ব আঁকা হয়েছিল এবং নতুন বিশ্বের ছবি তুলে ধরা হয়েছিল। এই মানচিত্রে ইউরোপের কিছু অংশ, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল, পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জ এবং আটলান্টিক মহাসাগর রয়েছে। এখানে দক্ষিণ আমেরিকার বিবরণ বিশদে দেওয়া রয়েছে। এই মানচিত্রের বিন্যাস তৈরি করা হয়েছিল কোনও পোর্টোলান চার্টের উপর ভিত্তি করে, তৈরি হয়েছিল, যা সেই আমলে মানচিত্রের জন্য বহুল ব্যবহৃত বিন্যাস ছিল।

পিরি রেইস

1513 Piri Reis map, surviving fragment. Reproduction at House-Museum of Nunez de Balboa original at Istanbul Topkapi Library

কিতাব-ই-বাহরি

সম্ভবত প্রাক-আধুনিক যুগের নেভিগেশন সংক্রান্ত সবচেয়ে বিখ্যাত বইটি হল পিরি রেইস-এর লেখা কিতাব-ই-বাহরি। এই বইয়ে শুধুমাত্র নেভিগেশন সম্পর্কিত বিশদ তথ্য নেই, বরং তার পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরের নিকটে অবস্থিত শহরগুলি এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলির বর্ণনা প্রদানকারী নির্ভুল চার্ট রয়েছে। ভূমধ্যসাগরের প্রধান প্রধান বন্দর, উপসাগর, অন্তরীপ, উপদ্বীপ, দ্বীপপুঞ্জ, প্রণালী এবং নোঙর করার পক্ষে নিরাপদ স্থানগুলি সম্পর্কে বিশদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইটি নৌচালনার কৌশল এবং জ্যোতির্বিদ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নৌচালনা সম্পর্কিত তথ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে গভীরে আলোচনা করেছে। এটিতে প্রতিটি দেশ এবং শহরের স্থানীয় লোক এবং তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিতাব-ই-বাহরি মূলত ১৫১১-১৫২১ সালের মধ্যে কোনও এক সময় রচিত হয়েছিল, তবে এই বইটি ১৫১৫ থেকে ১৫২৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত তথ্য এবং আরও বিস্তারিত চার্ট অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছিল। বইটি উপহার হিসাবে সুলতান সুলেমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

পিরি রেইস-এর মৃত্যুদণ্ড

পিরি রেইস ১৫২৮ সালের পরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন, তবে তার পরে উসমানীয় সুয়েজ বহরের কমান্ডার হিসাবে তিনি ফের প্রকাশ্যে আসেন। তবে এরপরে হরমুজের ব্যর্থতা এবং তার জেরে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার ফলে শেষ পর্যন্ত সুলতান সুলেমান তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে মিশরের কায়রো শহরে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। পিরি রেইসের মৃত্যু হলেও তাঁর আঁকা মানচিত্র বিশ্ব ইতিহাসে তাঁকে চির স্মরণীয় করে রেখেছে।