পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সাত গম্বুজ মসজিদ

ID 143894692 © Ig0rzh | Dreamstime.com
ID 143894692 © Ig0rzh | Dreamstime.com

বাংলাদেশের পুরান ঢাকার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে যেমন লালবাগের কেল্লা কে আমরা চিহ্নিত করে থাকি, ঠিক তেমনি এ লালবাগের কেল্লা সমসাময়িক স্থাপনার তারিখের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে সেই তালিকা দুটি স্থাপনা দেখতে পাই। একটি হচ্ছে ধানমন্ডির মুঘল ঈদগাহ আর অন্যটি হচ্ছে সাত গম্বুজ মসজিদ। সাত গম্বুজ মসজিদ মানুষের মুখে মুখে সাতমসজিদ হিসাবে পরিচিত হয়ে যায় সময়ের আবর্তে। এখানে উল্লেখিত বিষয় হচ্ছে এই মসজিদটির নির্মাতা সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এর ছেলে উমাইদ খাঁ। এই মসজিদটি আসলে মুঘল আমলে নির্মিত একটি মসজিদ। এটি মুঘল সাম্রাজ্য মোগল আমলের অন্যতম নিদর্শন। ১৬৮০ সালে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে তার পুত্র মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির লালবাগ দুর্গ মসজিদ এবং খাজা অম্বর মসজিদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ঢাকা মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড অর্থাৎ কাটাসুর থেকে শিয়া মসজিদে দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে বাশবাড়ি হয়। এই রাস্তায় যাওয়ার পথেই এই সাত গম্বুজ মসজিদ অবস্থিত।

স্থাপত্যের দিক থেকে এই সাত গম্বুজ মসজিদ খুব বেশি বড় আকৃতির বলা যাবে না। বরং আকৃতির দিক থেকে মসজিদটি নিতান্তই ছোট। আয়তাকার নামাজ-কোঠার বাইরের দিকের পরিমাণ দৈর্ঘ্যে ১৭.৬৮ এবং প্রস্থে ৮.২৩ মিটার। মসজিদের অভ্যন্তরে নামাযের উদ্দেশ্যে ৪ কাতারে ১০০ লোক নামাজ আদায় করতে পারে। এর পশ্চিমে দেয়ালের তিনটি মেহরাব আর পূর্ব দিকের দেয়ালে তিনটি খিলান একই বরাবর। এম বিখ্যাত মসজিদের পূর্ব পাশের এরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে একটি সমাধি। লোকমুখে কথিত আছে এটি শায়েস্তা খাঁর মেয়ের সমাধি। এই সমাধিটি ‘বিবির মাজার’ নামেও পরিচিত। এ কবর কোঠাটি ভেতর থেকে অষ্টকোনাকৃতি এবং বাইরের দিকে চতুষ্কোনাকৃতির।কিছুদিন আগেও এই সমাধিক্ষেত্র টি পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ সমাধিটি সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের পশ্চিম পাশে বাংলাদেশের বিখ্যাত মাদরাসা জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া অবস্থিত। এক সময়ে মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে যেত বুড়িগঙ্গা নদী। মসজিদের ঘাটে ভেড়ানো হত নৌকা লঞ্চ। সেই সময় মসজিদটির পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম চিত্তাকর্ষক ছিল।

পুরান ঢাকার নামজাদা পরিবারের সদস্যরা সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসতেন এই মসজিদে নামাজ পড়তে। আর শুকনো মৌসুমে তারা আসতেন টমটমে চড়ে।এই বর্ণনার সাথে মিল পাওয়া যায় চার্লস ডি ওয়াইলির ১৮১৪ সালে আকা মসজিদটির একটি স্কেচ এর। সেই স্কেচে মসজিদকে কিছুটা জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখানো হলেও নদীর আকার এবং মসজিদের স্কেল রীতিমতো চমকে দেয়ার মতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা সবই হারিয়ে গেছে। এই দৃশ্য বর্তমানে আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বড় বড় ইমারত উঠে গেছে মসজিদের চারপাশে। মাত্র ১০০ জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই মসজিদটির জন্য সামনে সুবিশাল উদ্যান, জ্যামিতিক সমতা লাল পাথরের অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী মুঘলদের বিখ্যাত স্থাপত্য রীতির জাঁকজমকের বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়।

হাজার ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় মসজিদটির বেশ ক্ষতি হয়। ভয়াবহ বন্যার কারণে পানি উঠে যায় মসজিদ প্রাঙ্গণে। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে ওই ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও মসজিদটি অনেক দূর থেকে দেখা যেত। আবার কোন কোন স্থানীয় বসবাসকারী এর মতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও অনেকদিন মসজিদের পাশে পানি ছিল। ওই সময় মিরপুর ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে তাকালেও মসজিদটি আলাদাভাবে চোখে পড়তো। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে। মসজিদটিতে সাধারণ করে দেয়া হলেও পরবর্তীতে তাঁর আসল রং ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। অবশ্য সমাধিটি এখনো সাদা রঙের হয়ে গেছে। আর নিকটবর্তী জায়গা গুলো দখল আর কংক্রিট গাথার ধ্বংসাত্মক স্বভাবের শিকারের কারণে মসজিদটি এখন ইট-পাথরের ভবনের মাঝখানে প্রায় লুকিয়ে আছে।