পুরুষদের জন্য ইসলামে বহুবিবাহ-এর অনুমতি রয়েছে কেন?

সমাজ Contributor
মতামত
ইসলামে বহুবিবাহ

ইসলামে বহুবিবাহ-এর সংজ্ঞা

‘বহুবিবাহ’ এর অর্থ হল এমন বিবাহ পদ্ধতি যেখানে এক ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে। বহুবিবাহ দুই ধরনের হতে পারে। একজন পুরুষ একাধিক নারীকে বিবাহ করবে অথবা একজন নারী একাধিক পুরুষকে বিবাহ করে। ইসলামী শরিয়তে পুরুষদের জন্য সীমিত সংখ্যক (একত্রে সর্বোচ্চ ৪ জন) বহুবিবাহ অনুমোদিত। অপরদিকে নারীদের জন্য একাধিক পুরুষকে বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম।

অন্যান্য ধর্মে বহুবিবাহ

পৃথিবীতে কুরআ’নই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ, যা বলে ‘বিবাহ করো মাত্র একজনকে’। আর কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যা পুরুষকে একজন স্ত্রীতে সন্তুষ্ট থাকতে নির্দেশ দেয়। এছাড়া কুরআন ছাড়া অনো কোনো ধর্মগ্রন্থে স্ত্রীদের সংখ্যার ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। বরং এসব ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী একজন পুরুষ বিবাহ করতে পারে যতজন নারীকে তার ইচ্ছা।

প্রাচীনকাল থেকেই অসংখ্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী একাধিক স্ত্রী রেখেছে। বাইবেলে যেহেতু স্ত্রীদের সংখ্যার ওপর কোনো বিধিনিষেধই নেই তাই আগের যুগের খ্রীস্টান পুরুষরা যতজন ইচ্ছা স্ত্রী রাখতে পারত। মাত্র কয়েক শতাব্দী পূর্বে তদের চার্চ স্ত্রীর সংখ্যা ‘এক’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে।

ইহুদী ধর্মেও বহুবিবাহ অনুমোদিত। তাদের তালমুদের বিধান অনুযায়ী আব্রাহামের (ইব্রাহীম (আঃ)-এর) তিনজন এবং সলোমনের (সুলাইমান (আঃ)-এর) শতাধিক স্ত্রী ছিল। ইহুদীদের সেফারডিক সমাজ যারা প্রধানত মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে বসবাস করত তারা নিকট অতীতের ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই প্রথাকে ধরে রেখেছিল। অতঃপর ইসরাঈলের প্রধান ‘রাব্বাঈ’ একাধিক স্ত্রী রাখার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে দেয়।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের আদম-শুমারী অনুযায়ী ভারতীয় হিন্দুরা বহু বিবাহের ক্ষেত্রে মুসলমানদের চাইতে অগ্রগামী। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একাধিক স্ত্রী গ্রহণ-সংক্রান্ত বিবাহ, হিন্দুদের মধ্যে ৫.০৬% আর মুসলমানদের ৪.৩১%। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দু বিবাহ-বিধি আইনে একজন হিন্দুর জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা অবৈধ ঘোষিত হয়। বর্তমানে এটা একটা ভারতীয় রাষ্ট্রীয় আইন। সুতরাং এটা নিয়ন্ত্রণ করছে একটি রাষ্ট্রীয় আইন; কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়।

এবার আসুন দেখা যাক, ইসলাম কেন ও কোন যুক্তির ভিত্তিতে একজন পুরুষকে একাধিক বা সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয়।

ইসলামে বহুবিবাহ বৈধতার কারণ?

১) কুরআন একাধিক বিবাহের নিয়ন্ত্রিত রূপকে অনুমতি দেয়

আল্লাহ বলেন, “নারীদের মধ্য হতে নিজেদের পছন্দমত দুই, তিন ও চার জনকে বিবাহ করো, কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তাদের মধ্যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; আর এতেই রয়েছে পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।” (আল কুরআন-৪:৩)

কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বহুবিবাহের কোনো মাত্রা নির্ধারিত ছিল না। ক্ষমতাবান প্রায় সকলেই এতে অভ্যস্ত ছিল। কেউ কেউ তো শত-এর মাত্রা ছাড়ালেও ক্ষান্ত হত না। এই অবস্থায় কুরআন সর্বোচ্চ চার জনের একটা মাত্রা নির্ধারণ করে দিল। ইসলাম একজন পুরুষকে দুইজন, তিনজন বা সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী গ্রহণের যে অনুমতি দিয়েছে তা কঠিন শর্তের মধ্যে আবদ্ধ। কেবলমাত্র তখনই তা সম্ভব যখন সকল স্ত্রীদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুবিচারমূলক আচরণ করতে পারবে।

কাজেই ইসলামে বহুবিবাহ কোনো বিধান নয়; বরং এটি হল ব্যতিক্রম। বহু মানুষ এই ভুল ধারণায় নিমজ্জিত যে, একজন মুসলিম পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু ইসলামে মূলত বহুবিবাহ অনুমোদনযোগ্য; এটি ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নাহ নয়, শুধুমাত্র মুবাহ বা জায়েজ। তাই কোনোভাবে এমন কথা বলা যাবে না যে, একজন মুসলিম যার একাধিক স্ত্রী আছে, সে তার তুলনায় উত্তম যার মাত্র একজন স্ত্রী আছে।

২) গড় আয়ুস্কাল পুরুষের তুলনায় নারীর বেশি

প্রাকৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের জন্মহার প্রায় সমান। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, নারী শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরুষ শিশুর চাইতে বেশী। এ কারণে শিশুকালে নারীর তুলনায় পুরুষের মুত্যুহার বেশি।

এছাড়া, যে কোনো যুদ্ধের সময় নারীর তুলনায় পুরুষরাই অধিক মারা যায়। সাধারণ দুর্ঘটনা ও রোগ-ব্যাধিতেও নারীর তুলনায় পুরুষের মৃত্যুহার বেশি। তাই সবদিক বিবেচনায় গড় আয়ুষ্কাল পুরুষের চাইতে নারীর বেশি। যে কোনো যুগের ইতহাস খুঁজে দেখলেও দেখা যাবে, বিপত্নীকের চাইতে বিধবার পরিমাণ অনেক বেশি।

৩) বিশ্বব্যাপী নারী জনসংখ্যা পুরুষের চাইতে অধিক

আমেরিকাতেই পুরুষের চাইতে নারী সত্তর লাখেরও বেশি। শুধুমাত্র নিউইয়র্কেই পুরুষের চেয়ে দশলাখেরও বেশি নারী। উপরন্তু নিউইয়র্কের এক-তৃতীয়াংশ পুরুষ সমকামী। অর্থাৎ এই লোকেরা কোনো নারী-সঙ্গ বা বিবাহ করতে আদৌ আগ্রহী নয়। ইংল্যান্ডে পুরুষ জনসংখ্যার সমসংখ্যক নারী বাদ দিলে চল্লিশ লাখ অতিরিক্ত নারী। একইভাবে জার্মানীতে পঞ্চাশ লাখ অতিরিক্ত নারী। রাশিয়ায় নব্বই লাখ। শুধুমাত্র আল্লাহই বলতে পারবেন যে, গোটা পৃথিবীতে একজন পুরুষের বিপরীতে একজন নারী ধরে নিলেও কত অবিবাহিতা নারী অতিরিক্ত থেকে যাবে!

৪) প্রতিটি পুরুষের জন্য মাত্র একজন স্ত্রী – বাস্তবতা বিবর্জিত একটি বিধান

উপরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, যদি পুরুষরা একজন নারীকে বিবাহ করে তবে কয়েক কোটি নারী অবিবাহিতা থেকে যাবে। এসব নারীদের জন্য তখন দুটি বিকল্প পথ খোলা থাকবে- হয় সে এমন একজন পুরুষকে বিবাহ করবে যার একজন স্ত্রী আছে অথবা তাকে হতে হবে “জনগণের সম্পত্তি”। শ্রুতিকটু হলেও এছাড়া অন্যকিছু সম্ভব নয়। তাহলে যারা রুচিশীলা তারা প্রথমটাই বেছে নেবে।

আবার বাস্তবতা হল, অধিকাংশ নারী অন্য নারীর সাথে তার স্বামীকে ভাগাভাগি করতে রাজি হবেন না। কিন্তু ইসলামে পরিস্থিতি বিবেচনায় তাই অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একজন মুসলিম নারী তার ঈমানের কারণে এই সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে অনেক বড় ক্ষতি ঠেকাতে অপর কোনো মুসলিম বোনকে জনগণের সম্পত্তি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন তাঁর স্বামীকে সর্বোচ্চ ৪টি স্ত্রী গ্রহণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে।

সুতরাং, ইসলাম যে বহুবিবাহের অনুমোদন দিয়েছে তা কখনও বাস্তবতা বিবর্জিত নয়; বরং সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত। তবে যেসব পুরুষ বহুবিবাহ করবেন তাদেরকে অবশ্যই সকল স্ত্রীদের সাথে সমান মু’আমালা করতে হবে। তাদের অধিকার আদায়ে কোনো কমবেশি করা যাবে না।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.