‘পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না’

sergey-shmidt-koy6FlCCy5s-unsplash
Fotoğraf: Sergey Shmidt-Unsplash

‘ফ্যাসাদ’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ সত্যচ্যুতি, নৈরাজ্য, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, অন্তর্ঘাত, চক্রান্ত, বিপর্যয় প্রভৃতি। এই শব্দ পবিত্র কোরআনে পঞ্চাশের চেয়ে বেশি স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো কখনো বিশেষ অব্যয়যোগে এটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ‘ফাসাদ ফিল আরদি’। ‘ফাসাদ ফিল আরদি’র প্রায়োগিক জায়গা মানুষের সামষ্টিক জীবন। এটি নৈরাজ্য থেকে বিপর্যয় পর্যন্ত উপর্যুক্ত শব্দগুলোর বিমূর্ত ভাব প্রকাশ করে।

মানুষের পাশবিক চরিত্র ফিতনা-ফ্যাসাদের জন্ম দেয়। এর বিস্তারের ক্ষেত্রে লোভ, হিংসা, জেদ, অহংকার, হঠকারিতা ও জিঘাংসার মতো নেতিবাচক স্বভাবগুলো অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। ইসলাম মানবজাতির শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তার লক্ষ্যে হিংসা, জেদ ও অসহিষ্ণুতা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর এর মধ্যে বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

ফিতনা একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। পবিত্র কোরআনে ফিতনা শব্দটি দ্বারা পরীক্ষা, বিপর্যয়, শাস্তি, অনিষ্ট, শিরক, জুলুম, বিবাদ এবং যুদ্ধকেও বুঝানো হয়েছে। সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতে আলল্গাহ বলেন, ফিতনা (বিপর্যয়) হত্যার চেয়েও জঘন্য। একই সুরার ১৯৩ আয়াতের অর্থ, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয়।’ এই আয়াতে ফিতনা বলতে শিরক বুঝানো হয়েছে। সুরা আনফালের ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা সেই ফিতনা (ফ্যাসাদ বা বিপর্যয়) থেকে বেঁচে থাক, যাতে শুধু জালিমরাই বিপর্যস্ত হবে না। আলল্গাহ কঠিন শাস্তিদাতা। একই সুরার ২৮ নম্বর আয়াত হলো, জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য ফিতনা (পরীক্ষা)।

সুরা মায়িদাহর ৭১ নম্বর আয়াতে- তারা ধরে নিল যে, আর কোনো ফিতনা (অনিষ্ট) হবে না। ফলে তারা অন্ধ ও বধির হয়েই রইল।

সুরা আনকাবুতের ২-৩ নম্বর আয়াতের বর্ণনা- মানুষ কি এ ধারণা করে বসে আছে যে, তারা শুধু ‘আমরা ইমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে? কোনো ফিতনায় তাদেরকে ফেলা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের ফিতনায় ফেলে (পরীক্ষা করে) জেনে নিয়েছি, তাদের কে সত্যবাদী, আর কে মিথ্যাবাদী।

বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি।

যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে অভিশাপ। তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস। (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৫)

যারা ঈমানের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তারা অভিশপ্ত জাতি। তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে। তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। এখানে তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে—

১ ।  আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। রুহজগৎ বা আত্মার জগতে প্রতিটি আত্মাই আল্লাহর ইবাদতের অঙ্গীকার করেছিল। দুনিয়ায়ও ঈমানদাররা আল্লাহর আনুগত্যের অঙ্গীকার করে। কিন্তু যখনই এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয় তখনই সমাজে অপরাধ বেড়ে যায়। সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

২ । আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় না রাখলে পারিবারিক কলহ বৃদ্ধি পায়। কখনো কখনো এটি হানাহানি ও মারামারির রূপ ধারণ করে। এর ফলে সমাজে অশান্তি নেমে আসে।

৩।  ফ্যাসাদ বা অশান্তি সৃষ্টি করা। এটি আসলে আগের দুটি কাজেরই ফলাফল। এর আলোকে জানা যায়, আল্লাহর অবাধ্যতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি হয়।