পৃথিবীর অক্ষের অবস্থান পরিবর্তনের প্রমাণ মিলল!

আবিষ্কার ০৪ মে ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
পৃথিবীর অক্ষের অবস্থান
Photo : Pexels

শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে এখনও অব্দি কলকারখানা,যানবাহন, শীততাপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র ইত্যাদি থেকে নির্গত দূষিত বায়ুর ফলে আমাদের পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৃক্ষ নিধন। আর এই সবকিছুর মিলিত প্রভাব পরিবেশে পড়ার ফলে বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হতে শুরু করেছে। এই বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বহু প্রাণী বা উদ্ভিদের প্রজাতির অস্তিত্ব লোপ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এইবারে প্রমাণ মিলল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর অক্ষের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। কোনো বস্তুর অক্ষের বিন্যাস নির্ভর করে বস্তুটির আয়তনে তার ভর কিভাবে বন্টিত আছে তার উপর।

সেই হিসেবে সেই বস্তুর অভিকর্ষ কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে অক্ষরেখা যায়। ভরের বিন্যাসে তারতম্য হলেই অক্ষরেখার পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়। চীনের Institute of Geographic Sciences and Natural Resources Research এর একদল গবেষক প্রমাণ করলেন বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ ব্যাপক হরে গলে যাওয়ায় পৃথিবীর অক্ষরেখা পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের এই গবেষণা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে Geophysical Research Letters জার্নালে।

কী কী কারণে পৃথিবীর অক্ষরেখার পরিবর্তন হতে পারে?

পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষরেখা কুমেরু আর সুমেরু তে পৃথিবী পৃষ্ঠ কে স্পর্শ করে। কিন্তু এরা কখনই একই বিন্দুতে নির্দিষ্ট বা স্থির নয়। পৃথিবীর ভরের বিন্যাসের পরিবর্তন হলে, মেরু বিন্দু এবং অক্ষরেখা – দুইয়েরই পরিবর্তন হয়। এতদিন অব্দি বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীর ভরের পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছিল। যেমন লাভা উদগিরণ, ভূমিকম্প, সমুদ্রের প্রবল স্রোত ইত্যাদির কারণে মেরু বিন্দুর অবস্থানের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ভূগর্ভস্থ জল পানীয় বা কৃষিকাজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ার পর তার বেশিরভাগটাই সমুদ্রে গিয়ে মেশে।

যার ফলে বিশ্বজুড়ে ভূগর্ভস্থ জলের ভরের বেশ ভালো মতই পরিবর্তন হয়। গত ৫০ বছরে মানুষ প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন টন ভূগর্ভস্থ জল তুলেছে, কিন্তু সেই জায়গায় কিছু ফেরত দেয়নি। এই বিশাল ভরের পুনর্বণ্টনও মেরু বিন্দু এবং অক্ষরেখার বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। এই গবেষণায় জানা গেল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে ১৯৯০ এর দশক থেকে এখনও অব্দি কয়েক লক্ষ কোটি টন হিমবাহ গলে সাগরে সেই জল গিয়ে জমা হয়েছে। সেই কারণে পৃথিবীর অক্ষরেখার স্থান পরিবর্তন হয়েছে।

কী কী জানা গেল এই গবেষণায়?

২০০২ সালে উৎক্ষেপিত গ্রেস নামের কৃত্তিম উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০০৫ আর ২০১২ সালে হিমবাহ গলে যাওয়ার সাথে সাথে মেরু বিন্দুর অবস্থানের পরিবর্তন মাপা হয়। দেখা যায় দুই ক্ষেত্রেই বরফ গলার সাথে সাথে বেশি করে অবস্থান পরিবর্তন ঘটে। এই গবেষণাতে ২০০২ সালের থেকে প্রায় তিন দশক আগের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায় নব্বই এর দশক থেকে মানুষের কার্যকলাপের জন্য মেরু বিন্দু এবং অক্ষরেখার স্থান পরিমাপ যোগ্য ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ১৯৯৫ সালে মেরু বরফ গলে সেই জল দক্ষিণ থেকে পূর্ব দিকে বাহিত হয়েছে। আরও জানা গেছে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই প্রবাহের গতিবেগের থেকে ১৯৯৫ – ২০২০ সালের গতিবেগ ১৭ গুণ বেশি। ১৯৮০ সাল থেকে এখনও অব্দি প্রায় ৪ মিটার সরণ ঘটেছে মেরুবিন্দুর।

আমেরিকার আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোনাথন ওভারপেকের মতে এটা বেশ উদ্বেগজনক। তিনি আরও জানান ,”এই গবেষণা প্রমাণ করে মানুষ এই গ্রহে ঠিক কতটা বাস্তব এবং ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে!” সুইৎজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভিনসেন্ট হামফ্রে জানালেন অক্ষরেখার এই পরিবর্তন অতটাও বিশাল নয় যে দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব পড়বে। তার মতে এর ফলে দিনের পরিমাণে হয়ত মিলিসেকেন্ডের তফাৎ হবে। কিন্তু তিনি জানাতে ভোলেননি, “এই গবেষণা প্রমাণ করে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে ঠিক কতটা বিশাল পরিমাণ ভরের স্থানচ্যুতি ঘটে। এতটাই বিশাল, যে পুরো গ্রহের অক্ষরেখার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম!”

বেড়ে চলা জঙ্গল নিধন, চাষাবাদের কারণে জমির পরিবর্তন এবং প্রচুর পরিমাণে দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এই গ্রহ এবং গ্রহবাসীদের উপর কী কী প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি নতুন দিক প্রকাশ পেল এই গবেষণায়।