পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কে জানেন?

Mansa Musa

আফ্রিকাকে বলা হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ অর্থাৎ যে মহাদেশ এখনও অন্ধকারে ডুবে আছে। সত্যিই কি তাই? সাধারণ ভাবে আমরা আফ্রিকা সম্বন্ধে যা পড়ি বা দেখি তার সবটাই ঘিরে থাকে দারিদ্র্য, যুদ্ধ, অসভ্য উপজাতি ইত্যাদি। কিন্তু এর ভিতরে যে লুকিয়ে আছে বহু চমকে দেওয়ার মতো ইতিহাস সেটা কজন জানে?

এই যেমন ধরা যাক মালি সাম্রাজ্যের কথা, পশ্চিম আফ্রিকার এক প্রভাবশালী এবং ধনী সাম্রাজ্য। এদের সম্পদের পরিমাণ যে ঠিক কত ছিল তা সম্বন্ধে আজও কোনো ঐতিহাসিক স্পষ্ট অনুমান করতে পারেন না। এই বংশেরই একজন সম্রাট ছিলেন মানসা মুসা। জন্মেছিলেন ১২৮০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ মালির রাজপরিবারে এবং ৩২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। মালি সাম্রাজ্যের দশম সম্রাট মুসার ২৫ বছরের রাজত্বকালে মালির পরিবর্তন ছিল চোখে পরার মতন।

সেই সময়ের মালি সাম্রাজ্যের মধ্যে ছিল আজকের সেনেগাল, জাম্বিয়া, নাইজার, নাইজেরিয়া, চাঁদ ও আরও কিছু দেশ। এই বিশাল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হবেন এতে আর সন্দেহ কী!

মুসার শাসনকাল ও মালির অবস্থা

মুসার আগে মালির সিংহাসনে ছিলেন সম্রাট দ্বিতীয় মানসা আবুবকর, অন্য পরিচয়ে মুসার দাদা। এই আবুবকর শেষ বয়সে এসে রাজত্বপাট ভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পরেন বিশ্বভ্রমণ, তিনি আর ফেরেননি সেখান থেকে।

মুসার রাজত্বকালে কিছু হোক না হোক মালির ইতিহাস সাক্ষ্য ছিল অপার ধনরাশি এবং অসীম বৈভবের। মুসা যদিও ছিলেন ইসলামে বিশ্বাসী তবে বৈভবে তাঁর আপত্তি ছিল না। সিংহাসনে চড়ে মুসা বিলাসের জন্য টাকা দিয়ে কেনা যায় এরকম কোনো বস্তুরই অভাব রাখেননি। বলা হয় যে এই চূড়ান্ত বৈভব চলেছিল মুসার মক্কা যাওয়ার আগে পর্যন্ত।

বেশ কিছুদিন রাজত্ব করে মুসা পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শিকাগো ট্রিবিউনে বেরোনো স্টিভ জনসনের রিপোর্টে এই যাত্রার চমকপ্রদ বর্ণনা পাওয়া যায়। মুসা বিলাসযাপনের ব্যবস্থা রাখার জন্য সঙ্গে নিয়েছিলেন ৩০০ জন সভাসদ ও ১২০০০ দাসদাসীদের। এছাড়াও ছিল ১০০ টা উট যাদের প্রত্যেকের পিঠে ছিল ৩০০ পাউন্ড করে সোনা, কিলোগ্রামে মোট হিসাবটা দাঁড়ায় ১৩৬০৭.৮০ কেজি (১ পাউন্ড= ৪৫৩.৫৯ গ্রম)।

বলা হয় যে মুসা যখন এই বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে মিশরের উপর দিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। এত পরিমাণ আর্থিক লেনদেনে স্বাভাবিক ভাবেই অসংগঠিত অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেয়। মিশরের এই বিপুল ধস সামলাতে সময় লেগেছিল প্রায় ১২ বছর।

অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক কারও কাছেই মুসার সম্পদের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। মুসার সাম্রাজ্যকালে মালি ছিল বিশ্বের বৃহত্তম সোনা উত্তোলনকারী দেশ এবং এই বিশাল স্বর্ণভান্ডারের অধিপতি মুসার সম্পদের পরিমাণ যে আজকের জেফ বেজোস, বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফের মোট সম্পদের থেকেও বেশি হবে এতে আশ্চর্য্যের কিছু নেই।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক রুডলফ ওয়্যারের মতে, কল্পনাতেও একজন মানুষ যতটা সোনার কথা ভাবতে পারে, মুসার সম্পদের পরিমাণ ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি, তাই এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে মুসা পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

মুসার সময়ে মালির উন্নতি

বিপুল ধনরাশির মালিক হয়ে বিলাসের সমুদ্রে ডুবে থাকলেও মুসা বেশ কিছু জনহিতকর কাজ করেছেন অবাক করে দেওয়ার মতো। ১৩২৫ খ্রীষ্টাব্দে আরব থেকে ফিরে আসেন বহু দার্শনিক ও দক্ষ কারিগরদের নিয়ে। এদের দিয়ে মুসা তৈরি করেন স্কুল, বিশ্ববিদ্যায়, মসজিদ, লাইব্রেরি ও আরও অনেক কিছু।

মুসা বিখ্যাত Djinguereber মসজিদ বানান এই সময় যা পরবর্তী ৫০০ বছর এক মূর্তিমান আশ্চর্য্য ছিল। এছাড়াও মুসা এমন একটি লাইব্রেরি বানান যেখানে চার থেকে সাত লক্ষ্য পান্ডুলিপি ও পুঁথি ছিল। এত বড় লাইব্রেরি পৃথিবীতে আর একটাই ছিল আলেজান্দ্রায়।

একথা মানতেই হবে যে আফ্রিকার আজকে এই অবস্থা হলেও একটা সময় যেকোনো দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলির থেকে উপরে ছিল। মানসা মুসার মতো রাজার অত্যাধিক বিলাসিতায় জীবন কাটালেও তাদের করা কাজ আজও আফ্রিকাকে জগৎসভায় স্থান দেয়।