পেস্তা ভরা মিষ্টি আর জুঁইয়ের সুবাসে মাতোয়ারা এই সিরিয়াকে চেনেন কি?

Syria Sweets
Syria, Damascus, late 2009, right before the war.ID 78531014 © | Dreamstime.com

এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র রূপে সিরিয়া বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় সিরিয়া রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক উপস্থিতি নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক। আনুমানিক ১০০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়পর্ব থেকেই সিরিয়া নব্যপ্রস্তরযুগীয় সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। যেখানে কৃষি এবং গবাদি পশু পরিচর্যার প্রভূত উন্নতি লক্ষ করা যায়। বলা যায় কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্যের ক্রম অগ্রগতিতে সিরিয়া প্রদেশের উল্লেখযোগ্যতা ছিল বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নিরিখে, আমাদের সামনে কেবলই তার ধ্বংসপ্রাপ্ত, আঘাতপ্রাপ্ত এবং ক্ষয়প্রাপ্ত ছবিটি ফুটে উঠছে। তবে এই ছবির বর্তমান উপস্থিতিসূত্র ধরেই অতীতের এক সুন্দর, প্রাণ-প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সিরিয়া প্রদেশের আরেক ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

তবে সিরিয়া প্রদেশকে কেবলই বর্তমান সময়ের নিরিখে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যায় না। কার্যত সিরিয়া ছিল এই পৃথিবীরই এক স্বর্গরাজ্য… যা আজ বিস্মৃত হলেও, একটাসময়ে যেখানে ছিল ভালবাসার কোমল স্নেহপরশ. আলিঙ্গনের ছত্রছায়া এবং একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকারবদ্ধ জীবনদর্শন..

আলেপ্পো নামটি বর্তমানে ইংরেজিতে বেশি ব্যবহৃত হলেও, শহরটির প্রাচীন নাম ছিল খালপি বা খালিবন। গ্রিক ও রোমানদের কাছে শহরটি ‘বেরোই’ নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া আলেপ্পোর আরেকটি প্রাচীন নাম ‘হালাব’, যা বর্তমানেও ব্যবহৃত হয়। তবে হালাব নামকরণের ইতিহাস এখনও মানুষের অজানা। কেউ কেউ ধারণা করেন, হালাব নামের অর্থ লোহা বা তামা হতে পারে। এর কারণ আলেপ্পো প্রাচীন সময়ে লোহা এবং তামার গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল।  সে যাই হোক এই আলেপ্পোর রাস্তায ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই জুঁই ফুলের সুমিষ্ট গন্ধ কোনও পর্যটককেই মনে করিয়ে দেবে, জায়গাটির নাম মধ্য-প্রাচ্যের আল-শামে। এই পথ ধরেই কত খলিফা এবং আমিররা হেঁটে গিয়েছেন, তাঁদের আগামী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

Aleppo Mosque

সিরিয়া প্রদেশের সন্ধ্যা নামে প্রায় ৬টা নাগাদ… সেই সময় যেন এক যাদুঘন মায়ায় ভরে ওঠত, সমগ্র শহরটি। এক অপরিসীম প্রাণশক্তির প্রকাশ লক্ষ করা যেত সমগ্র প্রদেশ ঘিরেই। এমনকি সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেও, দেশটি তার হলুদ রঙ হারাবে না। হলুদ ট্যাক্সিগুলির সম্মান বৃদ্ধি হত এবং প্রতিটি রাস্তার কোণে কর্ন বা ভুট্টাদানায় ভরা বড় রান্নার হাঁড়ি থাকত। সিরিয়ার মানুষেরা জিনিসপত্র কেনাবেচার সময় খানিকটা নুন বা মাখন দিয়ে ভুট্টা খাওয়া পছন্দ করেন। রাস্তাগুলিতে দেখা যেত সারি সারি আইসক্রিমের গাড়ি,  দম্পতিরা সোনার দোকানে ভিড় জমানোর পাশাপাশি মহিলারাও বাজার থেকে তাঁদের নানাবিধ পছন্দের সামগ্রী কেনাবেচা করত।

আলেপ্পোর দুর্গের সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করত। পরিদর্শকেরা এর ঐতিহাসিক আভিজাত্যের সঙ্গে নিজেদেরকে বিশেষভাবে যুক্ত করতে পারত। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন দুর্গ রূপেই বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে এই দুর্গের পূর্ব গরিমা আঘাতপ্রাপ্ত।

সিরিয়া প্রদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এর ঐতিহাসিক নির্দশন পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করলেও, এই প্রদেশের রাত্রিকালীন সৌন্দর্যও ছিল মায়াময়, স্বপ্নময়.. তারাভরা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে নৈসর্গিক স্বপ্নের একপ্রকার বাতাবরণ তৈরি হত পারিপার্শ্বিক পরিবেশেও।

প্রদেশটির এমনই বহুমুখী সৌন্দর্য, পারস্পরিক আন্তরিকতাবোধই ছিল প্রদেশের শ্রেষ্ঠ রসদ। সুতরাং ‘সিরিয়া’ শোনার সময় যে দেশটি আমাদের সামনে বা যে-দেশের ছবিগুলো আজ আমাদের সামনে আসে তার সঙ্গে কার্যত এর পূর্বেকার সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের কোনওপ্রকার যোগসূত্র নেই। এই প্রদেশ আক্ষরিক অর্থেই বৈচিত্র্যপূর্ণ। সিরিয়া প্রদেশটিতে অবস্থিত ছোট একটি গ্রামের নাম ‘মাওলৌলা’, তারা এখনও যিশুর ভাষায় অর্থাৎ আরামাইক ভাষাতে কথা বলে। যেখানে গির্জা এবং মসজিদগুলি আক্ষরিক অর্থে একে অপরের পাশে নির্মিত হয়, যেখানে ফায়রুজ এখনও রেডিও স্টেশনগুলিতে আধিপত্য বজায় রাখে, সেখানে প্রতিটি মিষ্টান্নে পেস্তা ব্যবহার করা হয় এবং কথ্য ভাষায় ‘কাফ’ অক্ষরটি এখনও উপেক্ষা করা হয়… বলাবাহুল্য এমনই বৈচিত্রপূর্ণ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রকৃতপক্ষেই পরিলক্ষিত হয়েছে প্রদেশের অন্দরে।

সুতরাং জনজীবন বিচ্ছিন্ন, বিক্ষুদ্ধ, শোকাচ্ছন্ন এই প্রদেশেও একসময় শান্তির বার্তা, আনন্দ প্রবাহ ছিল… অন্তত ইতিহাসের সূত্র ধরে সেই পরিচিতিটুকু পাওয়া যায়।