প্যারিসের বুকে এক টুকরো জান্নাত

Paris Mosqque
ID 92886798 © Javarman | Dreamstime.com

প্যারিসের বড় মসজিদ (Grand Mosque)-এর অবস্থান হল প্যারিস শহরের বোটানিকাল গার্ডেনের কাছে, শিন নদীর দক্ষিণে প্যারিসের ল্যাটিন কোয়ার্টারে।

এই মসজিদ যেন ফরাসী রাজধানীর বুকে আপনার নিজস্ব আলহামব্রা। এর ঠিক মাঝখানে রয়েছে অভিজাত ঝিনুক-প্যাটার্নের ফোয়ারা। তার চারধারে রয়েছে রিয়াধের মতো আরবি তোরণ-ঘেরা বিশাল উঠোন। এই মসজিদ হল ইসলাম শিল্প ও স্থাপত্যশৈলীর স্বর্ণযুগ যা অ্যান্ডালুসিয়ান (Andalusian) বা হিস্পানো মুরিশ (Hispano-Moorish) ঘরানার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতকে মুসলিম আইবেরিয়ায় এই স্থাপত্যশৈলীর বিকাশ হয়েছিল। এই শৈলীর বৈশিষ্ট্য হল, ছন্দবদ্ধ জ্যামিতিক প্যাটার্নে রঙিন টাইলসের ব্যবহার, সুদক্ষ ভাবে খোদাই করা ভেজিটাল মোটিফ এবং অভিজাতদর্শন সরু স্তম্ভ – যা অনুপ্রাণিত হয়েছিল প্রাচীন বাইজান্টাইন ডিজাইন এবং কার্সিভ আরবি ক্যালিগ্রাফি দ্বারা।

এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের খুঁটিনাটি প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের গায়ে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই কারুকার্য এতটাই নিখুঁত যে এই মসজিদে ঢুকলে আপনার মনে হতে পারে, ফেজ বা মেকনেস শহরের কোনও একটি মসজিদে ঢুকেছেন।

প্রাচীন মুরীয় সমকক্ষদের মতো এই গ্র্যান্ড মসজিদও গড়ে উঠেছে বিশাল এলাকাজুড়ে, নীল টাইলস দিয়ে সুন্দর কাজ করা ৩৩ মিটার উঁচু মিনারটি যেন আকাশ ছুঁয়েছে। এর একটি কেন্দ্রীয় প্রার্থনা হলের শীর্ষে রয়েছে একটি সবুজ ত্রিভুজাকার শঙ্কু। এর বিপরীতে রয়েছে একটি গম্বুজ, যা অনেক পরে তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে একটি বিশাল এবং সুদৃশ্য বাগান। রয়েছে নানা রকম গাছ, ফুলের সমাহার। সেই বাগান দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

এই ধরনের মসজিদ প্রথম তৈরি হয়েছিল স্পেনের সেভিল, কর্ডোবা এবং গ্রানাদা-র মতো শহরগুলিতে। সেই সময়ে মুসলিম শাসকদের অধীনে সেখানে যখন মুসলমান, ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা শান্তিতে বসবাস করত। প্যারিসের এই বড় মসজিদ বা গ্র্যান্ড মসজিদের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনী। তার মাধ্যমে বর্ণনা পাওয়া যায়, ইউরোপের আকাশে যখন বিপদে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল তখন কীভাবে এই মসজিদ স্পেনীয় ইহুদিদের রক্ষা করেছিল।

জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্যারিস জার্মানদের দখলে চলে গিয়েছিল এবং এই শহরের বহু ইহুদিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। সেই সময় যে ইহুদিরা মসজিদের কাছাকাছি বাস করতেন বা যাঁদের মুসলিম বন্ধুবান্ধব ছিল, সেই ইহুদিদের অধিকাংশই ছিলেন শেফার্ডিক ইহুদি, অর্থাৎ এই ইহুদিরা মুরীয় স্পেন থেকে এসেছিলেন। প্যারিসের উত্তর আফ্রিকান মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে তাঁদের অনেক মিল ছিল; উভয় সম্প্রদায়ই ছিল প্রাচীন মুরদের বংশধর, তাঁরা আরবি ভাষায় কথা বলত এবং পুরুষদের খাতনা করার পরম্পরা মেনে চলত।

শোনা যায় যে, সেই সময় এই মসজিদ এমন শতাধিক ইহুদিকে ভুয়ো নথি দিয়েছিল যাতে প্রমাণ করা যায় যে তাঁরা মুসলমান। মসজিদের এই সহযোগিতার ফলে তাঁরা নিরাপদে ফ্রান্স ছেড়ে অন্য দেশে যেতে সক্ষম হয়েছিল এবং হলোকোস্ট এড়িয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিল। এই কাহিনী অবলম্বন করে ২০১১ সালে একটি ফরাসি চলচ্চিত্র বানানো হয়েছিল যার নাম, লেজম লিবর( Les Hommes Libres বা ইংরাজিতে ফ্রি মেন)। এই ছবিটি বিভিন্ন দেশে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

প্যারিসের একটি মসজিদ স্থাপনের ভাবনা প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন উসমানীয় খলিফা, দ্বিতীয় আবদুল হামিদ। তিনি বহু বছর ধরে ফরাসী কর্তৃপক্ষের কাছে তদ্বির করেছিলেন যেন ফ্রান্সে মুসলমানদের জন্য মসজিদ গড়ার জায়গা দেওয়া হয়। অবশেষে তা মঞ্জুর করা হয়, এবং ১৯২২ সালের ১৯ অক্টোবরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলিম সমাজের গণমান্য ব্যক্তিত্বরা এখানে একটি অনুষ্ঠানে জমায়েত করেন এবং প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের মিহরাবের জন্য প্রথম পাথর স্থাপন করা হয়েছিল। এই মসজিদের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে লড়াইয়ে গিয়ে যে মুসলিম সৈন্যরা প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে বলেও মনে করা হয়।

ফ্রান্সের মুসলিম সৈনিকদের স্মৃতি স্মারক হিসাবে এই মসজিদের মিহরাব পাথর স্থাপন করা হয় সে দিন কাউন্সিল অফ প্যারিসের পোল ফ্ল্যরো (Paul Fleurot) বলেছিলেন, “এই আফ্রিকান ভাইদের বিশ্বস্ততা ও আত্মত্যাগের জন্য আমরা যতই ধন্যবাদ জানাই না কেন, তা যথেষ্ট নয়।” ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি গাস্তঁ দুম্যার্গ (Gaston Doumergue) এই মসজিদটির উদ্বোধন করেছিলেন।