প্রচলিতকে প্রশ্ন করা কি ভুলে গিয়েছে আজকের ইসলামী সম্প্রদায়?

dreamstime_xs_176578031
Terus istiqamah sewaktu Ramadan © | Dreamstime.com

একথা অস্বীকার করা যায় না যে মুসলিম জাতির গৌরবের দিন আজ সুদূর অতীত। আজও যারা মনে করে মুসলিমরা সেই সম্মানেরই অধিকারী তা দিবানিদ্রা ছাড়া আর কিছু নয়। কেমন ছিল সেই স্বর্ণযুগ যেখানে মুসলিমরা সভ্যতার অগ্রগতির পুরোভাগে থেকে তা পরিচালনা করছিল? দেখা যাবে তা আজকের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে সময় দোর্দন্ডপ্রতাপ সুলতানেরা শিক্ষাকেও স্বীকৃতি ও প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বিজ্ঞান, শিল্প, রীতিরেওয়াজ, সংস্কৃতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সবচেয়ে বড় কথা তখন মানুষ ছিল আকাঙ্খী ও জ্ঞানপিপাসু। প্রচলিতকেই অনড় সত্য মনে না করে প্রশ্ন করেছিল মুসলিম সমাজ।

আজও আমাদের সেই সমাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা উচিত যেখানে জ্ঞান ও ধর্ম পাশাপাশি বিরাজ করবে। যে দর্শনশাস্ত্র বা ইতিহাস পড়েছে সে ইসলামকেও জানবে আবার যে ইসলামকে জানে তার গণিতজ্ঞ হতেও বাধা থাকবেনা। এরকম একটা সমাজই আমাদের কাম্য। অবিশ্বাসীরা আল্লাহের কাছে যতটা নিকৃষ্ট একজন ধর্মান্ধদও ততটাই ঘৃণার। আল কোরআনে তিনি বলেছেন, “আমার সামনে ঘৃণ্যতম হলো তারা, যারা স্বেচ্ছায় অন্ধ ও বধির, যারা প্রশ্ন না করে শুধুই বিশ্বাস করে (৮:২২)” ।

কিন্তু আজ অনেক আলেম-মোল্লার মনে করেন যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করা ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী। আসলে তাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিধির জন্যই এই ধরনের মন্তব্য করে। মুসলিম ঐতিহ্যের এই অবক্ষয়ের পিছনে থাকা কারণগুলির এটি অন্যতম। এছাড়াও একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দি বা তার পরবর্তী শাসকদের অযোগ্য শাসন, পশ্চিমি আক্রমণ ও অন্তর্বর্তী দ্বন্দ্ব মুসলিমদের নামিয়ে এনেছে যোগত্যার সিড়ির অনেকটা নীচে।

কী করা যেতে পারে এই কলঙ্ক ঘোঁচাতে? এর কিছু উপায় আছে। প্রধান কর্তব্য হিসেবে শিক্ষা ও ধর্মের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। শিক্ষা মানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার সাথে সাথে ইসলাম শিক্ষা। সেই শিক্ষায় তারা যেমন মহান আল্লাহতায়ালার বাণী পড়বে কোরআন-হাদিসে সেরকমই জানবে সেই বাণী কীভাবে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। কীভাবে মুসলিম রাজত্ব আরবদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়েছিলো অটোমান সাম্রাজ্য থেকে ভারতবর্ষ ও পারস্যের মতো দেশে। সুবিখ্যাত স্থাপত্য-ভাস্কর্যে থেকে সুফি গান, শায়েরী চিত্রকলা সবকিছুরই মূল ছিল এই মুসলিম সংস্কৃতি। তাই সমগ্র মুসলমান জাতিরই তার ইতিহাস জানতে হবে। তার সাথে সাম্প্রতিক ইতিহাস, সমগ্র পৃথিবীর কথা, বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতিও শিখতে হবে।

আজকের দিনে মানবসভ্যতা হাজার গুণ উন্নতি করেছে, মানুষের কাছে সুযোগও আরও অনেক বেশি। তাই মুসলিম সমাজের প্রতিটি সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের উচিত এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া।

এই সমস্ত কিছু জানলে তবেই একজন প্রকৃত মুসলমান সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, মুসলমান জাতির প্রতিনিধিরা বলতে পারবে, আমরা শুধু ইসলামের নয় সমগ্র পৃথিবীর উন্নতিসাধন করব। ঠিক যেমন পৃথিবীর সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন আবু ইউসুফ আল কিন্দি, আবু রায়হান আল বিরুনি, ফকর আল-দিন আল রাজির মতো উচ্চশিক্ষিত দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, চিকিৎসাবিদরা।

মানবসভ্যতা আজ বহুগুণ উন্নত হয়েছে অতীতের সেসব দিনের থেকে আজ মানুষ অনেক বেশি সমর্থ যেকোনো বিষয়েই। তাই যে কোনো ইসলাম হিতাকাঙ্খী ব্যক্তির কর্তব্য এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে সামগ্রিক ভাবে উন্নতি করা। বিজ্ঞানের এই যুগে যদি তার সাথে ইসলামের মেলবন্ধন ঘটানো যায় তাহলে অবশ্যই আমরা অতীতের সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারব।