ইসলামী শরীয়াহর বৈশিষ্ট্য ও প্রচলিত আইনের সাথে পার্থক্য (২য় পর্ব)

আকীদাহ Contributor

১ম পর্বে আলোচিত ইসলামী শরীয়াহর বৈশিষ্ট্যসমূহের আলোকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, সমগ্র মানবতার প্রতি এই শরীয়াহ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহ ও করূণা। আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে নিজ নিজ জীবন ও সমাজের উৎকর্ষ সাধনের ব্যাপারে কেবলমাত্র তাদের নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধির উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষী করে ছেড়ে দেননি। বরং তাদেরকে প্রবৃত্তির স্বেচ্ছাচার থেকে মুক্ত করেছেন ইসলামী শারীয়াহর মাধ্যমে। এ কারণে মানব রচিত কোনো বিধানই প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও স্বেচ্ছাচার থেকে মুক্ত নয়। এগুলি থেকে মুক্ত ও পবিত্র হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত শরীয়াহর বিধান।

ইসলামী শরীয়াহর সঙ্গে প্রচলিত আইনের পার্থক্য

ইসলামী শারীয়াহর মতই প্রচলিত সকল মানব রচিত আইন যদিও জনস্বার্থের কল্যাণ সাধনের অঙ্গীকার করে এবং সমাজের আইন, শৃংখলা, নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করে, কিন্তু এর সাথে রয়েছে ইসলামী শারীয়াহর বিস্তর পার্থক্য। এ সকল পার্থক্যের আলোকে ইসলামী শরীয়াহর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে সকল মানব রচিত মতবাদ ও আইনের উপর। কারণ মানব রচিত আইন তো মানুষ তার সীমাবদ্ধ বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে রচনা করেছে আর ইসলামী শরিয়াহর প্রণীতা হলেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। নিম্নে ইসলামী শরীয়াহ ও প্রচলিত আইনের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরা হলঃ

১। ইসলামী শরীয়াহ আল্লাহ প্রদত্ত

মানব রচিত নয় বলে ইসলামী শরীয়াহ সকল ধরনের ত্রুটিমুক্ত। পক্ষান্তরে মানুষ যেহেতু সকল কাজে পদে পদে ভুল-ত্রুটি, অজ্ঞতা ও অক্ষমতার মুখোমুখি হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, ফলে মানুষের তৈরী আইন ও মতবাদ হয়ে থাকে নানাপ্রকার ভুল-ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ। তদুপরি পরিবেশ, প্রবৃত্তি ও ভাব-আবেগের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া থেকে এ আইন মোটেও মুক্ত থাকে না। অথচ শরীয়াহ প্রণয়ন করেছেন সর্বজ্ঞানী এমন এক ইলাহ যার থেকে আসমান ও জমীনের অণু পরিমাণ কোনো বস্তুও অদৃশ্য ও অজ্ঞাত থাকে না। ফলে স্বভাবতই তিনি তাদের সার্বিক কল্যাণের উপযোগী বিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন।

সুতরাং মানবজীবনর জন্য একটা সুসামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজনেই এ শরীয়াহ মেনে চলার আবশ্যকতা সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, বরং যে আইন মানুষের ভেতরের স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে ও যে আইন মানুষের বাহ্যিক জীবনকে পরিচালনা করে এবং এ দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সে শরীয়াহ মেনে চলা স্বাভাবিকতারই দাবি।

নিয়ম-কানুন ও আইন প্রণয়নে মানুষের মধ্যে বিস্ময়কর বিরোধিতার উপস্থিতি প্রচলিত বিভিন্ন আইনের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষ অসীম সম্পত্তির মালিক হতে পারে। পক্ষান্তরে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা এর পুরোপুরি বিপরীত। সেখানে ব্যক্তি মালিকানা বলে কিছু নেই। সুতরাং প্রকৃত সত্য কথা হল, মানুষ যত বুদ্ধিমানই হোক না কেন, সে আসলে অক্ষম। তার জ্ঞান সে যতই বিস্তৃত মনে করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা খুবই সীমিত। অতএব, মানুষের পক্ষে এমন বিধান রচনা করা অসম্ভব যা সকল মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য, সকলের জন্য কল্যাণকর ও উপযোগী এবং সকল মানুষের সুখ-শান্তির নিশ্চয়তাদানকারী হবে।

২। ইসলামী শরীয়াহর নীতি চারিত্রিক উন্নতির উপর গুরুত্ব আরোপ করা

ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিচালনা, ব্যক্তি ও সামগ্রিকভাবে সকলের সার্বিক কল্যাণ এবং জান, মাল, ইজ্জত-আবরুর হেফাজতের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আখলাক বা চরিত্র। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সালাম বলেছেন,

‘‘আমাকে উত্তম চরিত্র ও সৎ গুণাবলীর পরিপূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।’’

আর তাই ইসলামী শারীয়াহর যাবতীয় হুকুম-আহকাম চারিত্রিক মূলনীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে পুরোপুরিভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। যারা তাদের আচারে ব্যবহারে, কর্মে ও জীবনের পথ পরিক্রমায় চারিত্রিক সততার দাবী অনুযায়ী চলে, ইসলামী শারীয়াহ তাদের সাওয়াব ও পুরস্কারের ঘোষোণাও

করেছে। আর যারা এর বিপরীত পথে চলে ইসলামী শরীয়াহ দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য ব্যবস্থা করেছে যথাযথ শাস্তি ও লাঞ্চনার। অন্যদিকে মানবরচিত আইনে চারিত্রিক উতকর্ষের দিকে তেমন কোনো গুরুত্ব নেই।

যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চারিত্রিক অধঃপতনের চূড়ান্ত সীমা যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তি মানবরচিত আইনে মাত্র দুই অবস্থাতেই দেওয়া হয়। যখন জবরদস্তিমূলক ব্যভিচারে বাধ্য করা হয় এবং যখন একপক্ষের সম্মতি ও অপর পক্ষের অসম্মতি থাকে। এছাড়া অন্য সকল অবস্থায় ব্যভিচারের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা মানবরচিত আইনে নেই। মদপান, সমকামিতা ইত্যাদির মত আরও অনেক জঘন্য বিষয়ের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। অথচ ইসলামী শরীয়াহ এ সব কিছুকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয় সাব্যস্ত করেছে।

৩। তাকওয়া মেনে চলা

ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে আল্লাহ ও তাঁর প্রণীত বিধানের প্রতি সঠিক আকীদাহ পোষণ হচ্ছে সমাজে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় উপকরণ ও মূলভিত্তি। কেননা তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় হচ্ছে এমন জিনিস একমাত্র যেটিই সমাজের সকল মানুষকে সততা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারে এবং অন্যায়-অবিচার ও জুলুম থেকে রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে মানব রচিত কোনো আইনেই মানুষের স্রষ্টার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনের নূন্যতম গুরুত্ব নেই। ফলে সে আইন সমাজ থেকে সকল অন্যায় ও অবিচার দূর করতে অক্ষম।

আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের জন্যই কল্যাণকর এই শরীয়াহ সর্বত্র বাস্তবায়নের তৌফিক দান করুন। আমীন

(সমাপ্ত)

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.