প্রতিযোগিতাময় জীবনে পরোপকার করবেন না প্রতিযোগিতা ?

Sunrise with Arabic man running on better future road
© Paulus Rusyanto | Dreamstime.com

পরোপকার করা ভালো। সবার উপকারে আসে এমন মানুষ সমাজে সমাদৃত। সবাই তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে। মানুষ সামাজিক জীব। এমন অনেক কাজ আছে যা মানুষের একার পক্ষে করা সম্ভব না। এজন্য অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। একমাত্র নিঃস্বার্থ ও পরোপকারী মানুষ মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে। ভালো কাজ করতে গেলে স্বচ্ছ মনের দরকার হয়। কিন্তু প্রতিযগিতা মানুষের মনে হিংসা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। প্রতিযগিতা না করাই ভালো। আরেকজনের দেখে হিংসা করে আমাকেই সেই কাজ করতে হবে, এমন জেদ না করাই উচিত।

ইসলামে পরোপকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা ঈমানের দাবি এবং আল্লাহ তা‘আলার অত্যন্ত পসন্দনীয় কাজ। পরোপকার মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার। পরোপকার না থাকলে সমাজের স্থিতিশীলতা থাকে না। সমাজে একের পর এক অন্যায়, অত্যাচার, প্রবঞ্চনা আর খুনখারাবির মতো মন্দ কাজ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে যেভাবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তেমনি বৃদ্ধি পেতে থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ বিষয়ে দয়ার প্রতিচ্ছবি বিশ্বনবীর ঘোষণা হলো, ‘তোমরা জগদ্বাসীর প্রতি সদয় হও, তাহলে আসমানের মালিক তোমাদের প্রতি সদয় হবেন।’ (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১৮৪৭)

মানুষকে সামাজিক হতে হলে পরোপকারের বিকল্প নেই। একজন অন্যজনের বিপদে এগিয়ে আসা, পাশে দাঁড়ানো, সহমর্মিতা প্রকাশ করা, নিজের সুখের জন্য ব্যস্ত না হয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। এ বিষয়ে একটি প্রবাদ আছে—‘ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই রয়েছে প্রকৃত সুখ।’
এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

“যে ব্যক্তি মানুষের বেশি উপকার করে, সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ।”

মানুষের উপকার করা যায় বিভিন্নভাবে। অর্থ দিয়ে, শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে এবং বিদ্যা দিয়ে। আল্লাহ তা‘আলা একেকজনকে একেকরকম যোগ্যতা দিয়েছেন। যার যেই যোগ্যতা আছে, সে যদি তার সেই যোগ্যতাকে সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত করে, তবেই তার সেই যোগ্যতা সার্থক হয়। এর দ্বারা সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে সাফল্যমণ্ডিত হয়। বস্তুত আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে যে-কোনও যোগ্যতা দেনই এজন্যে যে, সে তা মানব-সেবায় নিয়োজিত করে নিজ জীবনকে সফল করে তুলবে।

ইসলামে বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। বর্তমানে যে করোনা মহামারি চলছে এ সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। ইসলাম চায় আপনার পাশের মানুষটি যেন কষ্টে না থাকে। তার মসিবতে আপনি তার পাশে দাঁড়াবেন। রাসুলে পাক (সা.) এর বিভিন্ন হাদিস এবং পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট, অন্যের উপকার করলে আল্লাহ খুশি হন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া সম্ভব।

রাসূল (সা.) পরোপকার সম্পর্কে বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তির সামনে ভালো কাজ করা সুযোগ আসে সে যেন এটাকে গুরুত্ব দেয়। কারণ কেউ জানে না যে, কখন এই সুযোগ শেষ হয়ে যাবে।

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন পরোপকারীর মূর্তপ্রতীক। মানুষের উপকার করে তিনি আনন্দিত হতেন। অন্যের বেদনায় ব্যথিত হতেন। কারো চোখে পানি দেখলে নিজের চোখকে ধরে রাখতে পারতেন না। টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ত তাঁর অশ্রু মুবারক।

রাসুল (সা.) যেদিন সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়েছেন, সেদিন তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে খাদিজাতুল কুবরা (রা.)-কে বললেন, ‘আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও।’ তখন উম্মুল মুমিনিন খাদিজাতুল কুবরা (রা.) নবীজিকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপমানিত করবেন না। কারণ আপনি আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করেন। গরিব-দুঃখীদের জন্য কাজ করেন। অসহায়-এতিমের বোঝা লাঘব করেন। তাদের কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৪৫৭)
মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)’র আরেকটি হাদিসে আহলে বাইতের সদস্য ইমাম বাকির (আ.) পরোপকারের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, তিনটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হয়। এগুলো হলো, একজন মুসলমান যখন অন্য মুসলমানকে খাবার দিয়ে তার ক্ষুধা মেটায় আল্লাহ তখন ভীষণ খুশি হন। এছাড়া কেউ যখন অন্যের সমস্যার সমাধান করে এবং কারো ঋণ পরিশোধ করে দেয় তখনও আল্লাহ খুশি হন।

আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে দানের কোনো বিকল্প নেই। আর যিনি পরোপকার করেন তার ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে উঠে। এ ধরণের সৎ কাজ গোটা মানব সমাজকেই প্রভাবিত করে এবং পরোপকারের সংস্কৃতি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা থেকে সবাই উপকৃত হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘যদি তোমরা দান, সদকা, সাহায্য-সহযোগিতা প্রকাশ্যে করো তাও ভালো, আবার তোমরা দুস্থ, নিঃস্ব, ছিন্নমূল, এতিম, গরিব, অসহায়দের অতি সঙ্গোপনে চুপে চুপে দান করো তা আরও উত্তম।’

অন্য আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, তোমাদের কাছে কোনো দুর্দশাগ্রস্ত গরিব, এতিম, অসহায় ও দুস্থ মানুষ কিছু চাইলে তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিও না।
যারা মানুষকে সাহায্য করে, আল্লাহও তাদের সাহায্য করেন। হাদিস শরিফে এসেছে ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি সংকটগুলো থেকে একটি সংকট মোচন করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার আখিরাতের সংকটগুলোর একটি সংকট মোচন করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের অভাব মোচনে সাহায্য করবে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে স্বাচ্ছন্দ্য দান করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-গুণ গোপন করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন করবেন।

আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ [মুসলিম : হাদিস- ২৬৯৯]

এমন অনেক সমস্যা আছে যা একা কোন ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে তার সাথে যদি এক বা একাধিক ব্যক্তির শ্রম ও প্রচেষ্টা জড়িত হয় তাহলে ঐ সব সমস্যার সমাধান সহজসাধ্য হয়ে যায়।