প্রথম আরবি লিপির আনুপাতিক লেখন পদ্ধতির আবিষ্কর্তা ইবনে মুকলাহ

Arabic caligraphy Al Ihlas
© Zamir Kadyzhev | Dreamstime.com

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন নিজেই একটি চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্যালিগ্রাফি। স্থান-কাল-সময়ভেদে কুরআন বিভিন্ন লিপিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কুরআনের প্রতিটি পাতায় সুন্দর সুন্দর নকশা প্রদান করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে একজন মুসলমানের কাছে ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে বড় উপাদান হচ্ছে কুরআনের লিখিত রূপ। এছাড়া কুরআনের বাণীর আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য একজন ক্যালিওগ্রাফারকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষণ করে। আল্লাহ তায়ালা নিজেকে একজন মহান শিল্পী হিসাবে ঘোষণা করেছেন। তাই সাধারণত একজন মুসলিম ক্যালিগ্রাফার নিজেকে সেই মহান প্রতিপালকের যথার্থ প্রতিনিধি মনে করেন।

মুসলিম ক্যালিগ্রাফি মূলত আরবি লিপিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ইতিহাসবিদদের তথ্য মতে, মুসলমানদের আগমনের পুর্বে থেকেই আরবে ক্যালিওগ্রাফির চর্চা ছিল। মুসলিমপুর্ব মক্কা নগরীতে আরবি লিপির প্রথম প্রচলন করেন বিশর ইবনে আবদুল মালিক আল কিন্দি। তিনি উত্তর আরবের হিরা এবং আনবার অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছ থেকে নাবাতিয়ান লিপি লেখার শৈল্পিক জ্ঞান অর্জন করেন। তখনকার ইহুদি এবং খৃস্টানরাও তাদের বইপত্রে হিব্রু এবং সিরিয়াক লিপির পাশাপাশি আরবি লিপির ব্যবহার করত।

শুরুর দিকে কুরআনের লিপি আজকের দিনের মত এত সুন্দর ও পরিপাটি ছিল না। ক্যালিগ্রাফি যেমন প্রতিনিয়ত তার অতীত সৌন্দর্যকে ছাড়িয়ে যায় ঠিক তেমনি টেক্সট ঠিক রেখে কুরআনের সজ্জাগত অনেক পরিবর্তনও সাধিত হয়েছে। প্রথমদিকে কুরআনে যতিচিহ্ন ও হরকত ছিল না, এতে আরবদের কুরআন পাঠে সমস্যা না হলেও অনারবদের মধ্যে জটিলতা তৈরি করতে থাকে। বিশেষ করে অনারব বিশ্বে দ্রুত মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরবি লিপির ভেতর এসব জটিলতা দূর করা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা জরুরী হয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান করেন আবুল আসওয়াদ আল দোয়াইলী (মৃত্যু-৬৮৮ই.)। তিনি যতিচিহ্ন, হরকতসহ বিভিন্ন নান্দনিক সংস্করণ করেন। এরপর আল খলিল ইবনে আহমদ আল ফারাহিদী (মৃত্যু-৭৮৬ই.) আবুল আসওয়াদ আল দোয়াইলীর পদ্ধতির পুনঃসংস্কার করেন।

রাসুল (সা.) এর যুগ থেকেই ক্যালিগ্রাফারগণ প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেছেন ক্যালিগ্রাফির উন্নয়ন সাধন করার জন্য। তখন সাহাবাগণ পাথর, গাছের ছাল, পাতা ইত্যাদিতে কুরআনের আয়াত লিখে রাখতেন, যা মুসলমানদের ক্যালিগ্রাফির প্রাথমিকরূপ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পরবর্তীকালে মুসলমানরা উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমী, সেলজুক, ইলখানী, তিমুরিদ, সুলতানী, মোগল প্রভৃতি রাজ্য শাসনামলে ক্যালিগ্রাফিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজকীয় সহযোগিতা প্রদান করে। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের ক্যালিগ্রাফি অত্যন্ত নান্দনিকরূপ লাভ করে এবং বিশ্বব্যাপি পরিচিত হয়ে ওঠে।

মুসলিম ক্যালিগ্রাফির প্রাথমিক লিপিসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান লিপি হচ্ছে কুফী লিপি। এ লিপির মাধ্যমে দীর্ঘ তিনশ বছর মুসলিম বিশ্বে কোরআনের কপি চালু ছিল। এ লিপিটি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে আঞ্চলিক প্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন ধারা তৈরি করেছে। কোথাও মাগরিবী, কোথাও আন্দালুসী, আবার কোথাও বিহারী লিপিতে রূপান্তরিত হয়েছে। উমাইয়া শাসন আমল আরবি লিপির জন্য গুরুত্বপুর্ণ সময় ছিল। কুফী লিপিতে ক্যালিগ্রাফি করা এ সময় অনেক ক্যালিগ্রাফারের পেশায় পরিণত হয়। পেশাদারিত্ব ব্যতীত কোন শিল্প টিকে থাকতে পারে না। তাই এ সময়টি ছিল মুসলিম ক্যালিগ্রাফির মাইলফলক।

পাশাপাশি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান একটি নতুন লিপির আবিষ্কার করেন। তিনি এর নাম দেন মানসুব লিপি। উমাইয়াদের একটি অবিস্মরণীয় অবদান হচ্ছে, জেরুসালেম বা বর্তমান ফিলিস্তিনের আল আকসা মসজিদের পাশে কুববাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক নামে বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ এবং তাতে ক্যালিগ্রাফির যুগান্তকারী প্রয়োগ। পাঠকদের বলে রাখা ভাল, আমরা অনেকেই আল আকসা মসজিদ এবং ওমর মসজিদের সাথে কুববাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রককে মিলিয়ে ফেলি। বস্তুত এগুলি আলাদা আলাদা স্থাপত্য।

এরপর আব্বাসীয় আমলে আরবি লিপি সৌন্দর্যমন্ডিত ও উন্নয়ন একই সাথে হতে থাকে। পর পর তিনজন খলিফার উজির আবু আলী ইবনে মুকলাহ (মৃত্যু: ৯৪০খ্রিস্টাব্দ) প্রথম আরবি লিপির আনুপাতিক লেখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি কোন ধরণের জ্যামিতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার না করেই এটা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। তাকে আরবি ক্যালিগ্রাফির জনক বলা হয়। ঐতিহাসিক ও শিল্পবোদ্ধাদের মতে, সত্যিকার চারুকলার বিষয় হিসেবে ক্যালিগ্রাফিকে (ক্লাসিক অর্থে) সুসংহত করেন রাজনীতিবিদ, কবি ও ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুকলা আল-বাগদাদী এবং তাঁর ভাই ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আবু আব্দুল্লাহ ইবনে মুকলা (মৃ. ৯৪৯ খ্রি.)। তারা দু-ভাই ক্যালিগ্রাফিকে আনুপাতিক লেখনীতে বিন্যস্ত এবং একে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন, যেটা ক্যালিগ্রাফির শিল্পমানকে উত্তরোত্তর শানিত করেছে। ইবনে মুকলাহর  ‘খত আল মনসুর’ আরবি লিপির উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা পালন করে। তিনি ইবনে মুকলাহ নাশখ (কপি করা) এবং সুলুস (এক তৃতীয়াংশ) লিপির আধুনিক আকার-আকৃতি রূপায়ন করেন। তিনি গোলায়িত টানা হাতের পেঁচানো কুফি লিপির উদ্ভাবন করেন এবং তার উত্তরসূরি ইরাকী কুরআন বিশেষেজ্ঞ ক্যালিগ্রাফার আলী বিন হিলাল ইবনে আল বাওয়াব এ লিপির উন্নয়ন করেন।

আরবি লিপির প্রধান ধারাসমূহ থেকে কিছু অপ্রধান ধারা আত্মপ্রকাশ করে। আব্বাসীয় খলিফা ও কাজীগণ তাদের দলিল দস্তাবেজে এবং সরকারি কাগজপত্রে তাওকী লিপির ব্যবহার করেন। এটাকে প্রধান ধারার ইযাযা লিপি বা অনুমদিত লিপি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।

ক্যালিগ্রাফির প্রধান ছয়টি শৈলী—সুলুস, নাসখ, মুহাক্কাক, রায়হানী, তাওকী ও রিকার সঠিক পদ্ধতিতে লেখার উদ্ভাবক ইবনে মুকলা আল-বাগদাদী । মূলত ক্যালিগ্রাফির সবগুলো শৈলী তাঁর পদ্ধতি অনুসারে লেখা হয়। এ জন্য তাঁকেই ক্যালিগ্রাফির জনক বলা হয়। এ বিষয়ে তাঁর লিখিত কিতাবের নাম হচ্ছে—রিসালাহ ইবনে মুকলা। আর পদ্ধতির নাম হচ্ছে—‘আল-খত আল-মানসুব’। ইরানী ঐতিহাসিকগণ তাকে পারস্য কর্মকর্তা ও নামের শেষে সিরাজী লিখেছেন। পর পর তিন জন আব্বাসীয় খলিফার সময়ে তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নির্যাতন ও শাস্তিভোগ করে কারাগারে মারা যান। ক্যালিগ্রাফিতে অসামান্য অবদানের জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ তাঁকে আবুল খত ওয়াল খাত্তাত, ইমামুল খাত্তাতীন ওয়া কাওয়ায়িদু খত্তিহ, নাবিউল খত ওয়াল খত্তাতীন উপাধি দিয়েছেন।

ইবনে মুকলা দুটি কুরআন নকল করেন। এ ছাড়া ত্রিশ পৃষ্ঠার একটি কাব্য “দিওয়ান” রচনা করেন। ঐতিহাসিক ইবনে নাজ্জার তার ইতিহাসগ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে মুকলা “ইখতিয়ারুল আশ’য়ার” নামে একটি নির্বাচিত কাব্যমালা লিখেছিলেন। তবে ইবনে মুকলার ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক সবচেয়ে বড় গ্রন্থটির নাম হচ্ছে জুমালুল খত। তিনি বাগদাদের পূর্বাংশে দজলা (টাইগ্রিস) নদের শাখানদী নাহরে মুসার তীরে একটি বিশাল ফুল ও খেজুর বাগানের ভেতর প্রশস্ত বাড়িতে বাস করতেন। সেটা ক্যালিগ্রাফি চর্চার একটি বিখ্যাত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ বলেন, তিনি এ বাগানবাড়িটি বানাতে দুই লাখ দিনার খরচ করেছিলেন। তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়ে তিনবার তার এ বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। দ্বিতীয়বার খলিফা কাহিরের নির্দেশে বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং ৩২৪ হি. শেষবার বাড়িতে আগুন দিয়ে ইবনে মুকলার সন্তানদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এতে ঐ এলাকার লোকেদের মুখে মুখে এ বাড়ির করুণ পরিণতি নিয়ে কবিতা উচ্চারিত হতে থাকে।

ইবনে মুকলা স্পষ্টবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠার কারণে শাসকদের কোপানলে পড়েন। প্রথমে তাঁর ডান হাত কেটে ফেলা হয়, তখন বাম হাত দিয়ে ক্যালিগ্রাফি কলম ধারণ করে লিখতে থাকেন। এরপর তাঁর বাম হাত কেটে ফেলা হয়। তবু তিনি দমে যাননি। কথিত আছে, সত্যকথন তিনি জিহ্বায় কালি লাগিয়ে লিখতে থাকেন। তখন তাঁর জিহ্বা কেটে তাঁকে মৃত্যুমুখে পতিত করা হয়। ক্যালিগ্রাফির প্রতি তাঁর এই উৎসর্গিত অবদান ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে।ক্যালিগ্রাফিতে এই ক্যালিগ্রাফারের অবিস্মরণীয় খেদমতের কারণে আজ বিশ্বের অগণিত ক্যালিগ্রাফির শিক্ষার্থী সহজে ক্যালিগ্রাফি করার সুযোগ লাভ করেছে।