প্রযুক্তি ও গোপনীয়তা: কী বলে ইসলাম?

প্রযুক্তি ২৬ নভে. ২০২০ Contributor
প্রযুক্তি
Photo by Dan Nelson on Unsplash

ইসলাম আমাদের সকলের আগে গোপনীয়তার পাঠ শেখায়। আর বর্তমানে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। একজন সহিহ মুসলমানের জীবনবোধের পাঠ নেওয়ার দুটি আদর্শ জায়গা। প্রথমটি অবশ্যই আল্লা’তালার বাণীর সংকলন, অর্থাৎ কুরআন। অপরটি সুন্নাহ বা হাদিস। শুধু জীবন বোধ নয়, শরিয়া আইন, সামাজিক নিয়ম সবকিছুর প্রসঙ্গেই কুরআন ও হাদিস গুরুত্বপূর্ণ। এই সব বিষয়ের দলিল হিসাবে এই দুটি পবিত্র ধর্ম গ্রন্থকেই আমাদের মেনে চলা উচিত।

অনেক সময় ইজমা ও কিয়াদের বিচারেরে থেকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় কুরআন বা হাদিসের বাণী ও ঘটনাসমূহকে।

আবার অনেকসময় কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত কোণও বিষয় একটু পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। মূলত বিভিন্ন মানুষ ও উরফের মধ্যে মাধআব ও মিনহাজের ফারাকের জন্য এই ভাবনার ফারাকটি দেখা যায়। এইরকম সময়ে আমাদের প্রিয় নবীর মুখের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে হবে এবং তাঁর ভাবনা অনুসারে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে। নবী রাসুল (সাঃ) এর ঐতিহ্যই তখন হবে আমাদের ঐতিহ্য।

 উপকারী প্রযুক্তি

এইক্ষেত্রেই উলেমাদের সাহায্য আমাদের প্রয়োজন। তাঁরা ইসলামই শিক্ষার মূল দর্শন ও শিক্ষার উপর ভিত্তি করে নানা জীবন দর্শন বা ফতোয়া আমাদের শেখান। একটা সময় ছিল যখন বৃহত্তর মুসলমান সমাজ এই ফতোয়া বা শিক্ষা একে অপরের সঙ্গে আদান প্রদান করতে পারত না। একজন উলেমার জ্ঞানের সঙ্গে আরেকজন উলেমার ভাব দর্শন মিলিয়ে দেখতে পারত না।

এই সমস্যার সমাধান করেছে আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা। টেকনোলজির এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা আমাদের ধর্ম, জীবনবোধ সম্পর্কে আরও সুচারুভাবে জানতে পারছি। আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ঐতিহ্যশালী ভাবনা চিন্তা।

একপক্ষে বলা যায়, প্রযুক্তি বা টেকনোলজি যদি সহিহ ভাবে ব্যবহার করা যায় তবে ইসলামী সভ্যতার জন্য তা আল্লাহর উপহার, মানুষের খলিফা হিসাবে অবশ্যই এই উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানানও উচিত।

গোপনীয়তা কী ও কেন?

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে-সঙ্গে গোপনীয়তার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে। একমাত্র প্রকৃত ইমানদার মুসলমানই অনলাইনে গোপনীয়তার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখবে। আধুনিক জীবনের সঙ্গে ঐতিহ্য মিলিয়ে দেওয়া মানে এই নয় যে নিজের ধর্মের মূলমন্ত্র ভুলে যাওয়া।

মহান নবী গোপনীয়তাকে অত্যন্ত প্রাধান্য দিতেন, আমরা তাঁর পথই অনুসরণ করব।

গোপনীয়তার অধিকারকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

১। সম্পত্তি বিষয়ক

২। ব্যক্তিগত তথ্য ও এক বা একাধিক ব্যক্তির মধ্যে আদান প্রদান করা কোণও কথা বা তথ্য

৩। কোণও প্রমাণ

প্রাথমিকভাবে আধুনিক আইন যেভাবে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমেন্ডেড হয়, শরিয়া আইন সেভাবে হয় না।

আর এই আইনেই বলা রয়েছে একজন সহিহ মুসলমানের উচিত পারস্পরিক গোপনীয়তা বজায় রাখা।

গসিপ বা অন্য ভাইয়ের অগোচরে তাঁর নিন্দা করা একেবারে নিষিদ্ধ।

কুরআনের নিষেধাজ্ঞা

পবিত্র ধর্মগ্রন্থে গোপনীয়তার ধারণাঃ আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) এর প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উপদেশ এই ছিল যে,

‘হে আলী! পরনিন্দা ও একের কথা অপরের নিকট লাগানো থেকে দূরে থাক। কারণ, পরনিন্দা রোযাকে বিনষ্ট করে আর কথা লাগানো কবর আযাবের কারণ হয়।’

ইসলামী শরিয়ত এভাবেই নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে মানা করেছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে

তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিয়ো না।’ [সুরা বাকারা, আয়াত- ১৯৫]

সুরা আন নুরে আবার বলা হয়েছে অন্যের অনুমতি ছাড়া তাঁর বাড়িতে প্রবেশ অনুচিত। এটি বিশেষ করে যুবক বা কিশোরদের উদ্দেশয়ে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, তফসির তাবারিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কারোর ঘরে প্রবেশের আগে সালাম বা আসসালামু আলাইকুম বলে প্রবেশ করতে। এভাবেই ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাওয়া শ্রেয়।

তফসির ইবনু কাটসিরে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কারোর গৃহে প্রবেশের আগে তিন বার তাঁর দরজায় কড়া নাড়তে হবে।

সমস্ত নির্দেশেই এটা স্পষ্ট যে গৃহ থেকে নিজেদের জীবন পর্যন্ত সমস্ত বিশয়ের গোপনীয়তা বজায় রাখার অধিকার সমস্ত ইমানদার ও জিম্মেদার মুসলমানের রয়েছে।

বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়া উচিত

সুরা আন নিসায় ইরশাদ হয়েছে,

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, গচ্ছিত বিষয় ওর অধিকারীকে অর্পণ কর; এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর তখন ন্যায় বিচার কর; অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক।

বিশ্বাস সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। ডিজিটাল অ্যাপ থেকে শুরু করে ইসলামী ভাই বেরাদর, সকলের উচিত পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখা। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়া।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শেষ যুগে কিছুসংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। তারা তোমাদের কাছে এমন সব অলীক কথাবার্তা উপস্থিত করবে, যা না তোমরা শুনেছ, না তোমাদের বাপ-দাদা শুনেছে। সাবধান! তোমরা তাদের থেকে বেঁচে থাকো এবং তাদের তোমাদের থেকে বাঁচাও। অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো, যাতে তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে না পারে এবং তোমাদের বিপথগামী করতে না পারে।’ [মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ১৫৪]