প্রশ্নের মুখে মুসলিম অ্যাপ, ইন্টারনেটে সুরক্ষিত থাকবেন কীভাবে?

প্রযুক্তি Contributor
ইন্টারনেট সুরক্ষা

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় সারা বিশ্বের ইসলাম সমাজ বেশ বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম অ্যাপের তথ্য চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।বলা হচ্ছে সেই তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে। যার মাধ্যমে টার্গেট করা হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের।

মুসলিম অ্যাপ কী?

একজন আধুনিক ও সহিহ মুসলমান নিজের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে-সঙ্গেবিভিন্ন মুসলিম অ্যাপের সাহায্য নামাজ আদায়ের সময়, কিবলার সন্ধান ইত্যাদিতে সময় ব্যয় করেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সন্ধানের মাধ্যমটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের স্মার্টফোন।

অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইসলামী দুনিয়ার নানা খবরাখবর রাখতে পারি। এমনকি কোনও নতুন জায়গায় বসবাস শুরু করলে আমাদের বাড়ির কাছে কোন মসজিদ আছে সেটাও জানতে পারি সহজে কোনও অ্যাপের সাহায্যে। এছাড়া পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের জন্যও নানাপ্রকার অ্যাপ বা অনলাইন সাইট ব্যবহার করা আমাদের কাছে জলভাত।

কিন্তু, সেই বিষয়েই সতর্কতামূলক একটি খবর সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। এক বা একাধিক অ্যাপ, যেগুলো মূলত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী জনগণের বিশ্বাস ও জীবনধারার উপর নির্ভর করে গঠিত, নিজেদের অ্যাপের মাধ্যমে গৃহীত তথ্য বিশ্বের প্রথম সারির দেশ আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, মাস কয়েক আগেই এরকম একটি অভিযোগ বিশ্বের বহুল প্রচলিত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ ফেসবুকের বিরুদ্ধে এসেছিল। সেখানে অভিযোগটি ছিল সমস্ত মানুষের তথ্য নিয়ে, কিন্তু এক্ষেত্রে তথ্যগুলি আমাদের উম্মাহর মানুষজনের তথ্য।

বিশ্বের এক বিরাট অংশের মুসলমান ভাই বেরাদররা এতে অত্যন্ত আহত ও অনিরাপদ বোধ করছেন। এমনিতেই প্রথম সারির দেশগুলিতে ইস্লামোফোবিয়ার প্রকোপ রয়েছে, সেখানে এতজনের তথ্য যদি সরকারের হাতে চলে যায় তাহলে কোণও সহি মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবনের বেশ খানিকটা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। কোনও মানুষের কাছেই তা কাম্য নয়!

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে বলাই যায়, তথ্য সুরক্ষা একজন মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম।

তথ্য সুরক্ষা কী ও কেন?

একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক, আপনি আপনার বন্ধুর সঙ্গে করাচি বেকারির বিস্কুট নিয়ে আলোচনা করছেন। কিছুক্ষণ পরে সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দেখলেন আপনাকে করাচি বেকারির বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে।

আপনি হয়তো একবার ইলেকট্রিক কেটল নিয়ে গুগলে সার্চ করেছিলেন, তারপর থেকে আপনাকে ক্রমাগত ইলেকট্রনিক্স জিনিসের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে যাচ্ছে যে ওয়েবসাইটেই আপনি যান না কেন।

খেয়াল করে দেখবেন, যেকোনো ওয়েবসাইটের ডানদিক বা বাম দিকে এই বিজ্ঞাপন গুলো দেখানো হয়।

কিন্তু এগুলো কীভাবে সম্ভব?

তার জন্য ‘কুকি’ বলে একটি বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে, আপনি যখন আপনার স্মার্টফোনে একটি ওয়েবসাইট খোলেন তখন আপনার ওয়েব ব্রাউজার আর ওয়েব সার্ভার (যে সফটওয়্যার প্রোগ্রাম ওয়েব ব্রাউজার-এর ডিস্ট্রিবিউশন করে)-এর মধ্যে কুকিজ ( অনেকগুলো)-এর আদান প্রদান হয়। কুকি অর্থাৎ একটি ইউনিক মেসেজ, এর মধ্যে আপনার ইউজার আইডি থাকতে পারে, কখনও ওয়েবসাইটে নিজস্ব ডিজাইন করা কোণও আইডেন্টিফিকেশন কোড থাকতে পারে।

এর মাধ্যমে সার্ভারের কাছে তথ্য জমা হতে থাকে যে আপনি কোণ সাইটে বেশিবার গিয়েছেন, বা অ্যাপের কোন ফিচার বেশি ব্যবহার করেছেন। আপনার পছন্দের ধরন, আপনি ঠিক কোন সময় বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। সেই অনুসারে সার্ভার আপনার পছন্দের সাইট আপনাকে দেখানোর চেষ্টা করে।

বিশেষ করে শপিং সাইট গুলো ক্রেতার মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য কুকির ব্যবহার করে। তাই জন্যই ঐ বিজ্ঞাপন গুলো আমরা দেখতে পাই।

আবার অনেক সময় আমরা কোনও অ্যাপকে আমাদের ফোনের গ্যালারি, মাইক্রোফোন আর লোকেশন অ্যাক্সেস করতে দিয়ে দিই, সেখান থেকেই আমাদের কথাবার্তা শুনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বুঝে নেয় ঠিক কী আমাদের পছন্দ। সেই অনুসারে বিজ্ঞাপন দেখায় ওয়েবসাইট গুলো। আসলে, আমরা এক একটি ডেটা পয়েন্ট, আর একটু অসাবধান হলেই আমরা আমাদের তথ্য অজান্তেই ইন্টারনেটে দিয়ে দিতে পারি।

যে সমস্ত অ্যাপের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তথ্য বিপণনের, সেগুলো হয়তো আদতে তথ্য বিপণন করতে চায়নি। কিন্তু সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তথ্য তাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। হয়তো এই অ্যাপ তথ্যগুলো সঞ্চয় করতে দিয়েছিল অন্য কোণও একটি সার্ভারকে, সেই সার্ভারের থেকে তথ্য চুরি হয়েছে। এক্ষেত্রে এটাই বলা যায়, এই অ্যাপগুলি উম্মাহর বিশ্বাস রাখতে অক্ষম, শুধু তাই নয়, তথ্য সুরক্ষার আইন সম্পর্কেও তাদের সম্যক ধারণা নেই।

প্রাথমিকভাবে এই ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের উচিত খুব স্বচ্ছ ও সহজ ভাষায় ইউজারকে জানানো উচিত কী ধরনের তথ্য তারা সংগ্রহ করছে, কাদের সঙ্গে সেই তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে এবং তথ্যের আইনি ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা।

এই ধাপ গুলো সঠিকভাবে মানা না হলেই তথ্য সংক্রান্ত এই সমস্যা দেখা যাবে।

ব্যবহারকারী বা ইউজার নিজের দিক থেকে কী কী সুরক্ষা-কবচ নিতে পারেন?

১। যে সমস্ত অ্যাপের ব্রাউজার বা ওয়েবসাইট ফর্ম্যাট রয়েছে, সেগুলোর ওয়েবসাইট ব্যবহার করা বেশি সুরক্ষাজনক।

২। ওয়েব ব্রাউজারের ডিফল্ট কুকি সেটিংস-এ গিয়ে সর্বোচ্চ প্রাইভেসি সেটিং করে রাখা, সব কুকি অ্যাক্সেপ্ট না করা।

৩। ফোনের লোকেশন ও ব্লুটুথ বন্ধ করে রাখা, প্রয়োজন ছাড়া ফোনের লোকেশন অন্য না করাই শ্রেয়।

৪। ব্রাউজারের অটোমেটিক লগইন ফিচার অয়াক্টিভেট না করা।

৫। একটু বাজেট থাকলে ভিপিএন ( ভারচুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) কিনে তারপর ইন্টারনেট ব্যবহার করা। তবে ভিপিএন কেনার সময় একটু দেখে নেওয়া উচিত, অনেক ভিপিএন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপকে স্লো করে দেয়।

৬। তথ্য বিপণনের খবর পেলে সেই অ্যাপের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া ও সেই অ্যাপ ফোন থেকে মুছে দেওয়া।

৭। নিজের সম্পর্কে যতটা সম্ভব কম তথ্য ইন্টারনেটে প্রদান করা। ফোনের লক ফিঙ্গার প্রিন্টের জায়গায় পিন দিয়ে করলে তা যথেষ্ট সুরক্ষিত। ফেশিয়াল রেকগনিশনের কোণও গেম বা অ্যাপ না ব্যবহার করাই ভাল।

৮। ফোনে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অ্যাক্টিভেট করে রাখতে হবে সবসময়।

ইসলামে গোপনীয়তাকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৪০০ বছর আগে আমাদের মহান নবী রাসুল (সাঃ) গোপনীয়তা কে ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে অন্যতম বলেছিলেন। তাঁর সুনাতে রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কারোর বাড়িতে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয় বা প্রবেশ করে, তার চক্ষু ফুঁড়ে দেওয়া জায়েজ।’ [মুসলিম ৩/১৬৯৯]

সহিহ মুসলমান হিসাবে আমাদের গোপনীয়তার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।