প্রাকৃতিক উপায়েই অ্যালার্জি হবে জব্দ!

গ্রীষ্মকাল বলতেই মনে পড়ে কালবৈশাখী, আমপান্না, লেবুর শরবত আর সন্ধ্যাবেলা বাড়ির ছাদে মাদুর পেতে আড্ডা। এদিক ওদিক টুকটাক ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে এই সব আনন্দ  মাটি তো হয়ই। নানারকম অ্যালার্জেনের রমরমা দেখা যায়  গ্রীষ্মকাল জুড়ে। বন্ধ নাক থেকে মাথা যন্ত্রণা… এই নিয়ে জেরবার হতে হয় মানুষকে। 

কী করে বুঝব অ্যালার্জি হয়েছেঃ 

  • নাক দিয়ে ক্রমাগত জল গড়ানো, সাইনাসে ব্যথা
  • চোখ চুলকোতে থাকা ও ক্রমাগত জল পড়া
  • হাঁচি ও কাশি, গলা ব্যথা
  • মাথায় যন্ত্রণা ও ক্লান্তি
  • র‍্যাশ ও ব্লিস্টারস

অ্যালার্জির কারণঃ

সেভাবে দেখতে গেলে গ্রীষ্মকালে অ্যালার্জির প্রকোপ বাড়ার নানাবিধ কারণ রয়েছে। এইসময় সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বস্তুর সংস্পর্শে আসতে হয় আমাদের। যেমন ধুলো, ফুলের পরাগ, ক্লোরিন, পোকা মাকড় মারার বাগ স্প্রে, সানট্যান লোশন, নানা রকম ছত্রাক, পারফিউম ইত্যাদি। 

ক্লোরিন ও বাগ স্প্রেঃ 

গ্রীষ্মকালেই সবচেয়ে বেশি ক্লোরিন-এর ব্যবহার বেড়ে যায়। বাড়ি , দোকান , হোটেল ইত্যাদি জায়গা  ক্লোরিন মিশ্রিত ব্লিচ দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এছাড়া সুইমিং পুলে বাধ্যতামূলক ভাবে ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়। অনেকসময় শাক-সব্জি পরিষ্কার করার জন্য ক্লোরিন ব্যবহার করেন বিক্রেতারা। এই ক্লোরিনে যদি কারোর অ্যালার্জি থাকে তাহলে এই জায়গা থেকে তাঁর সমস্যা শুরু হতে পারে। ক্লোরিন অ্যালার্জির লক্ষণ হল চোখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, ক্রমাগত জল পড়তে থাকা। র‍্যাশ, হালকা জ্বর-জ্বর ভাব , ক্লান্তি। 

এই অ্যালার্জি কমানোর সবচেয়ে সেরা উপায় ক্লোরিন থেকে দূরে থাকা। সুইমিং পুলের বদলে নদীতে সাঁতার কাটা যেতে পারে। সবুজ শাক সবজি গরম জলে ধুয়ে খাওয়া উচিত। বেশি করে হুইট গ্রাস জুস, সেলেরি , আপেল ও গাজরের রস, স্পিন্যাচ ও টম্যাটো জুস, আলফা আলফা শাক, ড্যান্ডেলিয়ন ও মিন্ট টি ইত্যাদি খাওয়া উচিত। 

ক্লোরিনের মতোই আরেকটি অ্যালার্জেন হল বাগ স্প্রে। পোকা, মশা যাতে না কামড়ায় তার জন্য নানাবিধ স্প্রে ও মলম ব্যবহার করা হয় ত্বকের উপর। এই সমস্ত স্প্রে-র কেমিক্যাল থেকে অ্যালার্জির সৃষ্টি হতে পারে। ফলস্বরূপ,মাথা যন্ত্রণা, র‍্যাশ ইত্যাদির প্রকোপ দেখা যায়। মুক্তির উপায় হল বাড়িতে বাগ স্প্রে বানানো। মিন্ট, ইউক্যালিপটাস বা ল্যাভেন্ডার দিয়ে বাড়িতে বানিয়ে নেওয়া যায় অ্যালার্জেন মুক্ত বাগ স্প্রে। অ্যালার্জির জ্বালাও নেই, গন্ধও সুন্দর।

সানস্ক্রিন ও সানট্যান লোশনঃ

গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হল সানস্ক্রিন বা সানট্যান লোশন। রোদে বেরোলে এর বিকল্প এখনও খুঁজে বের করা যায়নি। সানস্ক্রিনের অ্যামিনোবেনজোয়িক অ্যাসিড বা রক্সাডিমেট জাতীয় উপাদান থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। এই অ্যালার্জিতে শ্বাসকষ্ট, র‍্যাশ হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বমিও হয়। 

সেক্ষেত্রে বড় আকারের টুপি, স্কার্ফ ইত্যাদি দিয়ে নিজেকে আবৃত করে বেরোনো যেতে পারে। ন্যাচারাল সানস্ক্রিন হিসেবে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া যে সমস্ত সব্জিতে ক্যারোটিন ও লাইকোপিন রয়েছে সেই সব সবজি ও ফল খেলে প্রাকৃতিক ভাবে ইউ ভি রে প্রতিহত করা যায়। টম্যাটো, রেড বেল পেপার, তরমুজে লাইকোপিন রয়েছে। কুমড়ো, আম, গাজর ইত্যাদি ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার। 

ছত্রাক, মোল্ড ও মাইল্ডিউঃ

এই ধরনের অ্যালার্জি হয় মূলত গরমকালে বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টিতে ছত্রাকের জন্ম ও বৃদ্ধি। সেখান থেকে খাবার, বই, ঘরের দেওয়াল, বাগানের গাছপালায়,  ফল মূল সবজায়গায় ছত্রাকের আক্রমণ দেখা যায়। এই ধরনের অ্যালার্জেনের আক্রমণে র‍্যাশ, জ্বর আর ক্রমাগত হাঁচি হতে থাকে। 

সেক্ষেত্রে পাউরুটি জাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। মুখে মাস্ক পরে ঘরের বা বাগানের ছত্রাক পরিষ্কার করা উচিত। যতটা সম্ভব টাটকা শাক-সব্জি খাওয়া প্রয়োজন। বাসি ফল, কেক, খাবার না খাওয়াই ভাল। বিছানার চাদর ও স্নানের তোয়ালে একদিন অন্তর ধুয়ে দেওয়া উচিৎ। এই অ্যালার্জেনের সঙ্গে লড়াই করার একমাত্র উপায় পরিষ্কার থাকা। 

পারফিউম ও অন্যান্য অ্যালার্জিঃ 

পারফিউম ও ডিওডোরেন্ট থেকে হওয়া অ্যালার্জি আটকাতে সবার আগে ফেস মাস্ক ব্যবহার করা উচিৎ। এছাড়া অচেনা কোম্পানির পারফিউম ব্যবহার না করাই বাঞ্চনীয়। এছাড়া অন্যান্য অজানা কারণেও অ্যালার্জি হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। হাত ধুতে হবে নিয়ম করে। 

অ্যালার্জির উপশমঃ 

কারোর যদি অ্যালার্জির প্রবণতা থাকে তাহলে নিজের সঙ্গে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সবসময় রাখতে বলেন ডাক্তাররা। যদিও রিসার্চ করে জানা গিয়েছে এই ধরনের ওষুধের ব্যবহারে হার্ট ও নার্ভাস সিস্টেমের ক্ষতি হওয়ার চান্স থাকে। তাই জন্যই বিকল্প পদ্ধতির দিকে এখন জোর দেওয়া হয়েছে।

খুব বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি খেলে অ্যালার্জি দূরে থাকে।এছাড়া নেটলস, সেন্টিপেডা মিনিমা, চেস্টনাট গাছ, এশিয়ান রোজ, হার্ড অরেঞ্জ, অশ্বগন্ধা দ্বারা তৈরি ওষুধ ব্যবহার করলে উপশমও হয়, সাইড এফেক্টের পরিমাণও কম থাকে।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অ্যাকোনিটাম, আর্নিকা মন্টানা, আপিস মেলিফিকা জাতীয় ওষুধ অ্যালার্জি প্রতিরোধে সক্ষম। আপেল, পেঁয়াজ ও গ্রিন টি-তে কোয়ারটেসিন নামক এক উপাদান থাকে যা অ্যালার্জি প্রতিরোধে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় তাই এই খাবারগুলো যোগ করা ভীষণ ভাবে প্রয়োজন। 

গ্রীষ্মকালের আনন্দ যাতে অ্যালার্জি মাটি করতে না পারে তাই জন্য রইল এই সহজ গাইডেন্স। অ্যালার্জি মুক্ত দুনিয়ায় স্বাগত!