প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সাথী করে বাংলাদেশের জীবনযাপন

প্রকৃতি Contributor
জানা-অজানা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
© Eduardo Lopez Coronado | Dreamstime.com

দক্ষিণ এশিয়ার নদীমাতৃক সবুজ বনানী ঘেরা একটি ছোট্ট দেশ বাংলাদেশ। ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই দেশের ৮০ শতাংশই হল বন্যাপ্রবণ প্লাবনভূমি! প্রায় ২৩০ টি নদী যেন এই দেশে এক নকশী কাঁথা বুনেছে। বর্ষার সময় এই নদীগুলো একাধারে ভয়ঙ্কর এবং একইসাথে সুন্দর দৃশ্যরূপ ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশ সরকার এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের সাথে কাজ করা খন্দকার নিয়াজ রহমান তাই মজা করে বললেন, “বর্ষার সময় উড়োজাহাজে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কখনও যাবেন। আপনার মনে হবে যেন নদীগুলো স্থলভূমিকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং আমাদের দেশ হল ওই নদীগুলোর মধ্যবর্তী ছোট্ট ছোট্ট ডাঙা।”

আপনি যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এর সাথে ঘর করেন, তখন সেটাকে অস্বীকার নয় বরং মানিয়েই নিতে হয়। আর বাংলাদেশীরা অদ্ভুতভাবে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে এমনই অভ্যস্ত যে তাদের রোজকার জীবন এসবের মধ্যে দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বহমান। এই ‘বাংলাদেশী স্পিরিট’ আর তার সাথে সেদেশের সরকারের উন্নয়নমুখী এবং অভিনব দুর্যোগ মোকাবিলা পন্থা বাংলাদেশকে গত তিন দশকে ২০০ টিরও বেশি দুর্যোগ থেকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাংলাদেশ

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মঞ্জুর মুর্শেদ স্মৃতিচারণ করলেন, “সিলেটে স্কুলে যাওয়ার সময় মনে আছে আমাদের একটা সেতু পার করতে হত এবং প্রতি বছর বন্যায় সেই সেতু ভেসে যেত। আমরা তাতেই অভ্যস্ত ছিলাম, আর সেতু ভেসে গেলে অন্য রাস্তা খুঁজে নিতাম।” নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ২০০৩ সালেই এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, “বাংলাদেশে টেকটোনিক প্লেটের সংঘাতে উঁচুভূমি আরও উঁচু হয়ে যাচ্ছে এবং নীচু হাওর ভূমি আরোই নীচু হয়ে যাচ্ছে। তারসাথে মাঝে মাঝেই ভূমিকম্পের ফলে নদী তার প্রাকৃতিক গতিপথ বদলাচ্ছে।”

এই যেমন ২০২০ সালে বাংলাদেশের স্থলভূমির প্রায় ৪০ শতাংশই বন্যাকবলিত হয়ে গেছিল। তার সাথে মে মাসের সুপার সাইক্লোন যোগ হয়ে প্রায় ১৩০ কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্টের সাথে সাথে ১৫ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিলেন। বাংলাদেশ তাই যেন ‘চলমান প্রকৃতি’র দেশ। কোথাও ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা স্থলভূমি ধ্বংস করেছে তো কোথাও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে আনা পলি দিয়ে নতুন চর অর্থাৎ স্থলভূমি তৈরী করেছে। বাংলাদেশে তাই নদীর মর্যাদা বোঝাতে জাতীয় সংসদ ভবনের তিনদিকে প্রাকৃতিক জলাশয় সৃষ্টি করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশী স্পিরিট’ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা

প্রতিবছরের এই অবশ্যম্ভাবী দুর্যোগকে মেনে নিয়ে বাংলাদেশের সরকার এবং জনসাধারণ তাই অভিনব উপায় বার করেছে। সেতু ভেঙে গেলে বাংলাদেশে সহজলভ্য বাঁশ দিয়ে অনায়াসে সেতু বানানো হোক বা বিপুল সংখ্যক মানুষকে দুর্যোগের সময় স্থানান্তরিত করা হোক, সরকার মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। মসজিদের ইমাম হোক বা স্কুলের প্রধান শিক্ষক – দুর্যোগের পূর্বাভাস পেলে উনারাই মাঠে নেমে পড়েন সতর্ক করতে। লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাকা উঁচু বাড়িতে। আর এক্ষেত্রে সেই মডেলে স্কুল বা সরকার নির্মিত ভবন গুলি ভীষণ কাজে দেয়।

বাংলাদেশীরা ঘরে লাল ইঁট জমা করে রাখে যাতে ঘরে জল ঢুকলে বিছানা বা আসবাবের তলায় দিয়ে সেগুলো উঁচু করে ভেজার হাত থেকে বাঁচানো যায়। এমনকি যাতে প্রাণহানি বা সম্পত্তিক্ষয় কম হয় এবং যাতে স্কুলের পড়াশোনায় কম ব্যাঘাত ঘটে, বর্ষার মরসুমে স্কুলে ছুটি দেয়া হয়। এই অভিনব পন্থা এবং বাংলাদেশের মানুষদের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস প্রাকৃতিক দুর্যোগকে তাই দৈনন্দিন জীবনেরই অঙ্গ বানিয়ে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশে গেলে দেখবেন নদীতে পাড়ি দিয়েছে কোনো নৌকো আর হাসিমুখে কেউ ভাটিয়ালি শোনাচ্ছে – “কুল নাই, কিনার নাই, নাইকো দরিয়ার পাড়ি \ সাবধানে চালাইয়ো মাঝি .. আমার ভাঙা তরী। “

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.