প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষের অপকর্ম

andrew-buchanan
Fotoğraf: Andrew Buchanan-Unsplash

ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূপৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এমন আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প (Earthquake) বলে। সাধারণত তিনটি কারণে ভূমিকম্পের উত্পত্তি হয়ে থাকে—ভূপৃষ্ঠজনিত, আগ্নেয়গিরিজনিত ও শিলাচ্যুতিজনিত কারণে ভূমিকম্প হয়।

পবিত্র কোরআনে ‘ভূমিকম্প’ (Earthquake) নামের একটি সুরা আছে। এর নাম হলো ‘জিলজাল’। ‘জিলজাল’-কে ইংরেজিতে convulsion বলা হয়। এর ভয়াবহতা বোঝাতে when the Earth is shaken to (utmost) convulsion বলা হয়।

মানুষ সৎকর্মে কতটা আগ্রসর তা পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ জীবন সৃষ্টি করেছেন। এই বিষয়ে কোরআনের একটি আয়াত রয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সৎকর্মে কে অগ্রগামী তা পরীক্ষার জন্যেই তিনি জীবন সৃষ্টি ও মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছেন। (সেইসাথে তোমরা যাতে অনুধাবন করতে পারো) তিনিই মহাপরাক্রমশালী ও সত্যিকারের ক্ষমাশীল।” সুরাঃ মূলক, আয়াত- ০২ ।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষের অপকর্ম। এবং এই অপকর্মের পথ ধরেই মানুষ আল্লাহর সাথে তার বান্দার দূরত্ব দিনদিন বৃদ্ধি করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে। কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে, কিন্তু তা আত্মসাত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না)। জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর বাধ্যগত হয়ে মায়ের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করবে। বন্ধুকে কাছে টেনে নেবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দেবে। মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে। যখন সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রূপে আবির্ভূত হবে। সে সময় তোমরা অপেক্ষা করো— রক্তিম বর্ণের ঝড়ের (এসিড বৃষ্টি), ভূকম্পনের, ভূমিধসের, রূপ বিকৃতির (লিঙ্গ পরিবর্তন), পাথর বৃষ্টির এবং সুতো ছেঁড়া (তাসবিহ) দানার ন্যায় একটির পর একটি নিদর্শনগুলোর জন্য।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৪৪৭)।

আমরা যেসব ভূমিকম্প দেখতে পাচ্ছি তা মহান আল্লাহতালার প্রেরিত সতর্ককারী নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। নিদর্শন দিয়ে তিনি তার বান্দাদেরকে অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে চান। তিনি আরো চান তার বান্দারা যেন সবসময় সৎকর্মের নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন। আল্লাহ বলেন “ (মহাবিচার দিবসে) তোমাদের ওপর যে বিপর্যয়ই নেমে আসুক, তা হবে তোমাদের কর্মফল। যদিও তিনি অনেক কিছু এমনিই ক্ষমা করে থাকেন। ” সুরাঃ শুরা, আয়াত-৩০। সুতরাং আমাদের উচিত পরিপূর্ণ আন্তরিকতার সাথে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা। মহান আল্লাহ আরো বলেন, “ সে-সব জনপদের বাসিন্দারা যদি বিশ্বাস স্থাপন ও আল্লাহ-সচেতনতার নীতি অবলম্বন করত, তবে ওদের জন্যে আমি আসমান-জমিনের সকল কল্যাণের দ্বার খুলে দিতাম। কিন্তু ওরা সত্য অস্বীকার করেছিল, তাই ওদের কাজের উপযুক্ত শাস্তি ওদেরকে দিয়েছি। ” সুরাঃ আরাফ, আয়াত-৯৬।

আল্লামা ইবনু কাইউম (রহ.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ কখনো কখনো পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে ওঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। এটা মানুষকে ভীত করে। ফলে তারা মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করে। পাপকাজ ছেড়ে দেয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং তাদের কৃত পাপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়।’

রাসুল (সা.) বলেছেন, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং খুনখারাবি বাড়বে, তোমাদের সম্পদ এতো বাড়বে যে, উপচে পড়বে। (বোখারি, হাদিস নং : ৯৭৯)

তাহলে এখন আমাদের কি করা উচিত? আমাদের উচিত হবে খুবই আন্তরিকতার সাথে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে বেশি বেশি করে তওবা করা। যখনই ভূমিকম্প হবে তখন আমাদের অতি দ্রুত তওবা করে নিতে হবে এবং নিরাপত্তার জন্য আন্তরিকতার সাথে বারবার দোয়া করতে হবে। অর্থাৎ মহান আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ এবং ক্ষমার জন্য দোয়া করতে হবে। আর ভূমিকম্প হয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে প্রাকৃতিক এবং মানবিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ের সকলের পাশে নিজের সাধ্যমত দাঁড়াতে হবে। ইতিহাসে আছে, ভূমিকম্প হলে উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তার গভর্নরদের দান-সদকা করার প্রতি জোর দিয়ে চিঠি লিখতেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যা মানুষকে বিপর্যয় (আজাব) থেকে নিরাপদ রাখে। আর তা হলো, যথাসাধ্য সমাজে প্রচলিত জিনা-ব্যভিচার, অন্যায়-অবিচার রোধ করা। হাদিস শরিফে এসেছে, সমাজে ব্যভিচার বেড়ে গেলে ভূমিকম্প হয়।

আমাদের উচিত নিজের ভুলত্রুটি গুলোকে শনাক্ত করা, এবং তার থেকে নিজেকে মুক্ত করা আর মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে বেশি বেশি করে ক্ষমা চাওয়া।