বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার: আল কারাউইন

সংস্কৃতি ২৪ জুলাই ২০২০ Contributor
বিশ্বের প্রাচীন গ্রন্থাগার
Roof of the University of al-Karaouine in Fes, Morocco, which is the oldest continually operating university in the world.

প্রাচীন গ্রন্থাগার শুনলেই মনে হয় অজস্র ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে সেখানে।

যারা বই পড়তে ভালবাসি, তারা নিশ্চয়ই কোনও না কোনও । এটা মনে রাখতে হবে, প্রাচীন গ্রন্থাগার কেবলমাত্র বই সংগ্রহশালা রূপেই কাজ করে না।

ক্ষেত্রবিশেষে তা কিন্তু ঐতিহাসিক কোনও দলিলের সংগ্রহশালা হিসেবেও কাজ করে। আজ এই প্রসঙ্গে আমরা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার আল কারাউইনের কথা বলছি।

এটি আফ্রিকার মরক্কোতে অবস্থিত। হাজার বছরের বেশি পুরানো এ গ্রন্থাগারটি বিশেষভাবে সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল।

গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই গ্রন্থাগারে ভিড় করতেন বিভিন্ন দেশ থেকে আগত জ্ঞানী-গুণী, পর্যটক ও ছাত্র-শিক্ষক।

আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার। এখানে স্থান পেয়েছে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিল্পকলা, ইতিহাস-ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রগামী দেশ মরক্কোর অতীত সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য।

ইসলামের প্রথম যুগের নানা পান্ডুলিপি পাওয়া যায় এ পাঠাগারে। এর মধ্যে আছে, স্পেনীয় দার্শনিক ইবন রুশদের কুফিক লিপিতে লেখা নবম শতকের একটি আল-কোরআন এবং দশম শতকে লিখিত প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনীর বিভিন্ন অংশ। এর মধ্যে রয়েছে- হরিণের চামড়ার ওপর লেখা ইমাম মালিকের মুওয়াত্তা, ইবনে ইসহাকের সিরাহ, ইবন খালদুনের প্রধান রচনা মুকাদিমাহ এবং ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আহমেদ আল-মনসুরের কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটি কোরআন।

প্রাচীন গ্রন্থাগার ও তার সূচনাঃ

৮৫৯ সালে আরবের একজন ধনী নারী ফাতেমা আল ফিহরির ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফেজ নগরীর কারাউইন নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সে বছরই মসজিদের আঙিনায় তিনি গড়ে তোলেন আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আল-কারউইন বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠাগার।

এখানে ছাত্র হিসেবে শিক্ষালাভ করছেন ইবন খালদুন, তাঁর আগে এসেছিলেন সন্ত-কবি ও দার্শনিক আল-আরবি।  প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৩৫৯ সাল পর্যন্ত একটানা চালু ছিল পাঠাগারটি।

প্রাচীন গ্রন্থাগারের ক্ষয়ক্ষতিঃ

তবে বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধে উপনিবেশবাদীদের দখল-বেদখলের ঘটনায় ফেজ শহর আঘাতপ্রাপ্ত হলেও আল-কারাউইন মোটামুটি অক্ষতই ছিল।

পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে কখনও কখনও বন্ধ থেকেছে এই তথ্যসমৃদ্ধ জ্ঞানের ভান্ডারটি।

পাঠাগারটির পরিকাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে।

অনেকসময়েই বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পাঠাগারে প্রবেশ করে নানা রকম ক্ষতিও করেছে। কিন্তু সে সবই প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

১৯১৩-৫৬ সাল পর্যন্ত ঔপনিবেশিক আমলে ফ্রান্স পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগারটিকে আরেকবার ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও সনদ বিতরণ বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে।

আধুনিকীকরণঃ

১৯৫৬ সালে আবার মরক্কো স্বাধীনতা লাভ করার পর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন বাদশা মুহাম্মদ।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত, পদার্থ, রসায়নসহ বিভিন্ন বিজ্ঞান বিভাগ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। ১৯৫৭ সালে খোলা হয় নারীশিক্ষার্থী বিভাগ। ১৯৬৩ সালে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে মরক্কোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি আল-কারাউইন পাঠাগারকে বাঁচাতে নতুন পদক্ষেপ নেয় মরক্কোর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। পাঠাগারটিকে পুনরায় চালু করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তারা নিয়োগ দেয় আজিজা চাউনি এবং তার স্থাপত্যদলকে। প্রকৌশলীরা ভবনের ভিত্তি পুনরায় স্থাপন করেছেন, সেখানে নতুন করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু করেছেন এবং ভবনের সবুজ রঙের ছাদের প্রতিটি টাইলস আগের মতো দৃষ্টিনন্দন রূপে তৈরি করেছেন।