প্রাচীন সভ্যতা থেকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, তার মধ্যেই বেড়ে উঠেছে ‘প্রাচ্যের প্যারিস’

aerial view of beirut

বেইরুট… মধ্যপ্রাচ্যের এই শহরের নাম শুনলে বেশিরভাগ মানুষের মনে পড়ে গৃহযুদ্ধ, গ্রিন লাইন আর সদ্য ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের কথা। কিন্তু  যদি ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটা যায় তাহলে দেখা যাবে শহরটায় লুকিয়ে রয়েছে অনাঘ্রাত কিছু গল্প। যা এক অন্য বেইরুটের সন্ধান দেয়। 

আরবি ভাষায় ‘বির’ শব্দের অর্থ ‘কুয়ো’ বা ‘ঝর্ণা’, অনেকের মতে সেখান থেকেই এসেছে বেইরুট নামটি। মিশরের তেল-আল আমার্না থেকে প্রাপ্ত খৃষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের কুনেইফর্ম লিপি থেকে প্রথম এই শহরের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়।  হিটাইটের বিরুদ্ধে লড়াই-এ সাহায্য চেয়ে তৎকালীন শাসক লিপিটি লিখেছিলেন মিশরের ফারাও চতুর্থ আমেনহোটেপকে। 

বেইরুটের পরিবর্তন শুরু  আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের হাত ধরে। বলা হয় তিনি দখল করার পরেই গ্রেকো-রোমান সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে উঠতে শুরু করে। বাণিজ্যিক বন্দর, সামরিক ঘাঁটি, বড় বড় প্রাসাদ , থিয়েটার সবই একে একে গড়ে উঠেছিল গ্রিস ও রোমের আদলে।  ২০১ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দে এই শহর এথেন্সের সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পাশ্চাত্য আইন ব্যবস্থার ধারক জাস্টিনিয়ান কোডের সূচনা এই শহরেই।  তবে, ৫৫১ খ্রিস্টাব্দে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সামুদ্রিক বন্যায় শহরটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।

অটোমান সাম্রাজ্যঃ

৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান আরব শাসকদের হাতে আসে বেইরুট, তবে ১১১০ খ্রিস্টাব্দে  শহরটির দখল নেয় ক্রিশ্চান ক্রুসেডাররা। ৭৭ বছরের সাম্রাজ্যের পর ১১৮৭ ক্রিস্টাব্দে সালাদিনের হাতে ক্রুসেডাররা পরাজিত হয় এবং ইসলামের দখলে আসে এই শহর। কিন্তু মাত্র ছয় বছর পরেই সাইপ্রাসের রাজার হাতে পরাজিত হতে হয় তাঁকে। শেষে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দে, মুসলমান বংশোদ্ভূত মামলুকরা ক্রিশ্চান শাসনের অবসান ঘটায়। 

অতঃপর, ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে দুর্ধর্ষ তুর্কী-অটোমানরা বেইরুট দখল করে। তারা শহরের অভিজাতদের সঙ্গে এক চুক্তি করেছিল।চুক্তিনুসারে, নির্দিষ্ট পরিমাণ করের বিনিময়ে শহরের আমিররা কিঞ্চিৎ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতে পারতেন। অষ্টাদশ শতকে আমিররা বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র শুরু করলে সেই আঁচ ইউরোপেও গিয়ে পৌঁছয়। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় ১৮৪০ ব্রিটিশ ও অটোমান সৈন্যবাহিনী একযোগে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে শহরটি পুনরায় দখল করে। ইউরোপ-এর সঙ্গ বেইরুট ও লেবাননের আদান প্রদাণ সেই শুরু। ক্রমে বেইরুট ব্যবসা বাণিজ্য ও শিক্ষা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়া ও আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত হয় সিরিয়ান প্রোটেস্টান্ট কলেজ। যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যর বিখ্যাত ‘আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বেইরুট’ নামে পরিচিত।

বিশ্বযুদ্ধ থেকে ষাটের দশকঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে যুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষ ও বিদ্রোহের জন্য বেইরুটে তুর্কী শাসন শেষ হয়ে প্রথমে ব্রিটিশ সামরিক শাসন ও পরে ফরাসী শাসনের সূচনা হয়। এই সময়েই বেইরুট লেবাননের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্দর থাকার কারণে বেইরুট গুরুত্বপূর্ণ শহরের তকমা পেয়েছিল। খাদ্য, ওষুধ ও সৈনিক প্রদানে বিশেষ ভূমিকা ছিল শহরটির। ১৯৫৮ সালের মধ্যেই বেইরুট মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ব্যবসা বাণিজ্য ও ব্যাংকিং –এর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ- এই সময় থেকেই শুরু হয়। মধ্যবিত্তের উন্নতি, শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে ভ্রমণব্যবস্থার এমন উন্নতি হয়েছিল যে ইউরোপ ও আমেরিকার সুপারস্টাররা বেইরুটে এসে সময় কাটিয়ে যেতেন। যে কারণে এর নাম হয়েছিল ‘প্রাচ্যের প্যারিস’। 

এই সময়কে বিশ্লেষণ করতে বসলে দুই রকম মতামত দেখা যায়,

এক দল মানুষের মতে,  তৎকালীন বেইরুট ধনীদের বিলাসস্থল ছিল। বড় বড় হোটেল, থিয়েটার, ক্যাফে, ক্লাব ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। শহর শুধু ধনীদের কথা ভাবত, গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে পা রাখা গরীবদের প্রতি তা ছিল বেশ নির্মম।

অন্য দলের মতে, তখনকার বেইরুট আদতে সামরিক ও রাজনৈতিক আখড়া। মতামত, বিদ্রোহ, অস্ত্রের আদান প্রদাণ ও গৃহযুদ্ধের বীজ সবই প্রথম রোপণ হয় সেই সময়। লিবারেশন অফ প্যালেস্তাইন, আরব ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট সবেরই আঁতুড় এই শহর। 

নিরপেক্ষ ভাবে দেখলে এটা বোঝা যায় আদতে দুটো মতই সত্যি। ব্যবসায়ীদের নানারকম ব্যবসার জন্য শহরের অর্থনীতি ক্রমশ ধনী হয়ে উঠছিল, শিক্ষার প্রসার বাড়ছিল , ফলে, রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৬০-এর বেইরুটকে এক কথায় বিশ্লেষণ করতে চাইলে ‘স্বাধীন ভাবনা চিন্তার শহর’ ছাড়া আর কিছু মনে আসে না। যে শহর প্রতিমুহূর্তে পালটে গিয়ে অবাক করে দিতে পারে। 

গৃহযুদ্ধের সময়কালঃ

তবে ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ এর তকমা ছিল ক্ষণস্থায়ী। ১৯৭৫-এ শুরু হওয়া প্রায় ১৫ বছরের সিভিল ওয়র বা গৃহযুদ্ধে এই নাম ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। রক্তক্ষয়ী ইতিহাস কী হতে পারে তা বেইরুট প্রথম দেখল এই গৃহযুদ্ধে। ১৯৫৮-এ ফুয়াদ চেহাব লেবাননের প্রেসিডেন্ট হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেইরুট ও লেবাননকে আরও উন্নত করবেন। কিন্তু সেই উন্নতির জন্য যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন তা ধীরে-ধীরে দূর্নীতি ও অত্যাচারে পরিণত হয়। এদিকে লেবাননে অবস্থিত প্যালেস্তিনিয় শরণার্থী ক্যাম্পে প্যালেস্তিনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পি এল ও) ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। লেবানন সরকার তাতে মদত দিয়েছে এমন অভিযোগ করে ইজরায়েল শুরু করে চোরাগোপ্তা আক্রমণ। এদিকে দেশের উত্তরে সক্রিয় হয়ে ওঠে মারোনাইট। পি এল ও আর মারোনাইট উপজাতির মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ। ক্রমাগত চলতে থাকা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বেইরুট হয়ে উঠেছিল নৈরাজ্যবাদের উপকেন্দ্র।  এদিকে কুখ্যাত ‘গ্রিন লাইন’ তৈরি হল শুধুমাত্র মুসলমান ও ক্রিশ্চানদের ভাগাভাগি করতে। শহরের মধ্যে দিয়ে দগদগে ক্ষতের মতো সেই লাইন পড়ে রইল। পার হলেই নিশ্চিত মৃত্যু। ওদিকে ইজরায়েল তখন বোমাবর্ষণ শুরু করে দিয়েছে। ম্যাসাকার, খুন-জখম, আত্মঘাতী আক্রমণ তখন বেইরুটের অলিতে গলিতে।  শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯-এ স্বাক্ষরিত তৈইফ চুক্তির মাধ্যমে স্তিমিত হতে শুরু করে অসহিসষ্ণুতা। ১৯৯০-এ  যুদ্ধ থামে, তবে ক্ষত রয়ে যায় দেওয়ালের গায়ে বুলেটের গর্তে আর ধ্বসে পড়া এক অর্থনৈতিক অবস্থায়। 

২০০৬-এ এই গৃহযুদ্ধের আতঙ্ক অল্প হলেও ফিরে আসে ইজরায়েলি-হেজবোল্লাহ আতঙ্কবাদী দলের আক্রমণে। বেইরুটবাসী বুঝতে পারে এখনও অনেক ঝড় সামলাতে হবে। 

 বেইরুটের ইতিহাসে চোখ রাখলে বোঝা যায় তার উত্থান কখনোই মসৃণ ছিল না।  অজস্র লড়াই, অজস্র আঘাত বুকে নিয়ে শহর গড়ে উঠেছে। সেই লড়াই এখনও থামেনি। শহরের অলিতে গলিতে, মানুষের শিরায় শিরায় বয়ে চলেছে তা।  তাই জন্যই বেইরুটবাসী সহজে ভেঙে পড়েন না, কারণ তাঁরা জানেন প্রতি ঝড়ের পরেই সূর্যোদয় অবসম্ভাবি।