প্রাচ্যের যে রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ব্রাসেলস শহরে

brussels mosque
Mosque and playground at the islamic cultural center in Brussels. Photo 58489856 © - Dreamstime.com

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের ভীষণ পাশ্চাত্য রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না শহরের পূর্বদিকে, ওক ও বার্চ গাছের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ঊনবিংশ শতকের এক টুকরো প্রাচ্যের ইতিহাস। পার্ক দ্যু সিনকোয়ান্টেনায়ারের উত্তর পশ্চিমাংশে, ঠিক যেখানে ব্যস্ততম রাস্তা এন-২৩ এসে মেশে অ্যাভিন্যিউ ডে লা রেনেসাঁর সঙ্গে, সেখানে পৌঁছলেই এক চমক অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। 

প্রাচ্যের চমক

যে চমকপ্রদ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ইসলামের কথা, সেই ইতিহাস আর কিছু না, ব্রাসেলসের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। ঐতিহাসিকদের মতে এই মসজিদের পত্তন হয় ১৮৭৯ শতকে, যা কি না ইংল্যান্ডের লিভারপুল ও ওকিং-এ স্থাপিত হওয়া মসজিদেরও আগে। এই অপরূপ প্রাচ্যঘেঁষা গোলাকৃতি স্থাপত্যটির স্থপতি আর্নেস্ট ভ্যান হামবিক। তবে, শুরুতে এটি কিন্তু মসজিদ ছিল না। ডাচদের কাছ থেকে স্বাধীনতালাভের ৫০তম বর্ষ উদযাপনের জন্য তৎকালীন রাজ আদেশে আর্নেস্ট এটিকে প্রদর্শনীশালা হিসেবে তৈরি করেছিলেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল বেলজিয়ামের ক্ষমতা ও স্থিতির বিজ্ঞাপন। রাজা দ্বিতীয় লিয়োপোল্ড, যিনি বেলজিয়ামের দ্বিতীয় রাজা ছিলেন (১৮৬৫-১৯০৯) তাঁরই উদ্যোগে সমস্ত স্থাপত্য লৌহ, প্রস্তর ও কাচ দিয়ে তৈরি হয়। স্থাপত্যে ভীষণ সুন্দর কারুকার্য করা হয়েছিল। প্রায় ৩০ হেক্টর জায়গাবিশিষ্ট একটি পার্ক স্থাপন করা হয়েছিল যাতে বাগান, কৃত্রিম জলপ্রপাত বর্তমান। সেটিই পার্ক দ্যু সিনকোয়ান্টেনায়ার নামে পরিচিত। 

ব্রাসেলস মসজিদের পুরনো ছবি দেখলে দেখা যায় মসজিদের সামনে ক্ষুদ্র গম্বুজ ছিল একখানা। মসজিদের পার্শ্বে একটি উত্তর আফ্রিকার ফাতিমিদ আমলের নকশা করা মিনার অবস্থিত ছিল। প্রবেশদ্বারের উপর মাঝারি এক গম্বুজ ছিল, যার নীচে গথিক স্টাইলের জানলা। একতলার প্রবেশদ্বারটি আফ্রিকার মুরিশ জনজাতির দরজার ডিজাইন থেকে অনুপ্রাণিত ছিল।

স্থাপিত হওয়ার পর-পরই ১৮৮০ শতকে চার্লস-মেরি-এমিল ওয়াটার্সের ‘কায়রো অ্যান্ড দ্য ব্যাঙ্কস অফ দ্য নাইল’ নামক ফ্রেস্কোটি এই প্রদর্শনী গৃহে প্রদর্শিত হয়। ১১৪ মিটার উঁচু এই ফ্রেস্কোটি আঁকতে শিল্পীর সময় লেগেছিল ৬ মাস। 

তবে, এই জৌলুস ছিল ক্ষণস্থায়ী। বিংশ শতকের মধ্যভাগেই এই স্থাপত্যটি অবহেলিত হতে শুরু করে। মূল কারণ হিসাবে বলা চলে সেই সময় পৃথিবী ব্যতিব্যস্ত ছিল পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে। এই বিশ্বযুদ্ধের ঋণাত্মক প্রভাব এসে পড়েছিল বেলজিয়ামেও। 

বিংশ শতাব্দীর গল্প

অতঃপর ১৯৬৭ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক ফয়জল ইবন আবেদ আল আজিজ বেলজিয়ামে পা রাখেন। ফয়জল ইবন এসেছিলেন মূলত বেলজিয়ামের শাসকের সঙ্গে তেলের চুক্তি করতে, কিন্তু শহর ভ্রমণকালে এই অবহেলিত প্রাচ্য ঘেঁষা স্থাপত্যটি তাঁর নজর কাড়ে। তক্ষুনি বেলজিয়ামের শাসক বদাউন সিদ্ধান্ত নেন এই স্থাপত্য সৌদির রাজাকে উপহার দিতে হবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, উপহার পেয়ে রাজা ফয়জল প্রস্তাব দেন প্রদর্শনীগৃহটি মসজিদে পরিণত করার। 

ইতিমধ্যে ১৯৬৩ সাল থেকেই ব্রাসেলসে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছে খুব অল্প সংখ্যক মরক্কো ও টিউনিশিয়ার উদ্বাস্তু মুসলমানদের হাত ধরে। শহরে তখন আস্তে-আস্তে ইসলাম কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে। তাদের কাছে রাজা ফয়জলের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত আনন্দদায়ক হয়েছিল।

টিউনিশিয়ান স্থপতি মোঙ্গি বৌবেকারের নির্দেশনায় অতঃপর প্রদর্শনীগৃহের পরিবর্তন শুরু হয়। গৃহের মধ্যস্থলে একটি প্রার্থনাকক্ষ তৈরি করা হয়, অত্যন্ত হালাল সজ্জায় সজ্জিত এই প্রার্থনাকক্ষে একটি মিহরাব রয়েছে যাতে মুসলমানরা কাবার দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতে পারে। 

১৯৭৮ সালে এই মসজিদ সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সৌদি আরবের রাজা ফয়জল ও বেলজিয়ামের রাজা বদাউন একসঙ্গে মসজিদের উদ্বোধন করেন। 

আজকের অবস্থা

বর্তমানে এই মসজিদ বেলজিয়ামের ইসলামিক কালচারাল সেন্টার হিসাবে পরিচিত। নিয়মিত এখানে ইসলাম শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। ভাষা থেকে ধর্ম সবই পড়ানো হয় এখানে। সাধারণ মানুষের জন্য এই মসজিদ সারাদিন খোলা। কেউ কেউ এসে এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন। টুরিস্টদের জন্যও এই মসজিদের দরজা খোলা। 

তাই আপনার পরের বেলজিয়াম ট্রিপে ব্রাসেলসের এই মসজিদ দেখে আসতে ভুলবেন না।

কীভাবে যাবেনঃ ব্রাসেলস এয়ারপোর্ট থেকে ১৫ নম্বর বাস সরাসরি মসজিদে যায়। মেট্রো নিলে লাইন ১ ও লাইন ৫ ধরে শুমান স্টপে নেমে মিনিট পাঁচেক হাঁটতে হবে।

মসজিদের পাশেই শায়েরবিক নামক অঞ্চলে অনবদ্য হালাল স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়, বেলজিয়ান মুসলমানদের নিজের হাতে বানানো। মসজিদ দেখতে গেলে কিছুতেই শোয়ারমাটা খেতে ভুলবেন না।