ফিতরা আদায়ে কী মনে রাখবেন প্রবাসীরা?

Photo 73121026 © Ishark Talar - Dreamstime.com

ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তা মুসলিমদের ওপর আবশ্যক করেছেন। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, ছোট, বড় সব মুসলিমের ওপর রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ‘সা’ খেজুর, অথবা এক ‘সা’ গম জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং নামাজের পূর্বে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’ -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যা আদেশ করেছেন তা আল্লাহতায়ালা কর্তৃক আদেশ করার সমতুল্য। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হুকুম মান্য করল, সে আল্লাহর হুকুমই মান্য করল। আর যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল, আমি আপনাকে তাদের জন্য পর্যবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।’ -সূরা আন নিসা: ৮০
সদাকায়ে ফিতর সম্পর্কিত হাদীসগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মোট পাঁচ প্রকার খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়: যব, খেজুর, পনির, কিসমিস ও গম। এ পাঁচ প্রকারের মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক সা’ দিতে হবে। আর গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে আধা ‘সা’ দিতে হবে। এটা হল ওজনের দিক দিয়ে তফাত। আর মূল্যের দিক থেকে তো পার্থক্য রয়েছেই। যেমন-
(ক) আজওয়া (উন্নতমানের) খেজুরের মূল্য প্রতি কেজি ১০০০/- টাকা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৩২৫৬/- তিন হাজার দুই শত ছাপ্পান্ন টাকা।
(খ) মধ্যম ধরনের খেজুর যার মূল্য প্রতি কেজি ৩০০/- টাকা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৯৭৭/- নয়শত সাতাত্তর টাকা।
(গ) কিসমিস প্রতি কেজি ২৩০/- টাকা করে হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৭৪৮/- (সাত শত আটচল্লিশ) টাকা।
ঘ) পনির প্রতি কেজি ৫০০/- টাকা করে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ১৬২৮/- (এক হাজার ছয় শত আটাশ) টাকা।
ঙ) গম প্রতি কেজি ৩৫/- টাকা হিসাবে ধরা হলে একজনের সদকায়ে ফিতর দাঁড়ায় ৫৭ টাকা।
হাদীসে এ ৫টি দ্রব্যের যেকোনোটি দ্বারা ফিতরা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যেন মুসলমানগণ নিজ নিজ সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যেকোনো ১টি দ্বারা তা আদায় করতে পারে।
দেশের বাহিরে যেসব প্রবাসী ভাইয়েরা আছেন, তারা চাইলে ফিতরা দিতে পারবেন। তবে কিছু নিয়ম কানুন আছে। তারা ফিতরা দেবেন কাদেরকে? অবস্থানের দেশের অভাবীদের? নাকি মাতৃভূমির অভাবীদের?
প্রবাসীরা হিসাব করবেন অবস্থানের দেশের পণ্য ও মুদ্রার হিসাবে। এ বিষয়ে ফতোয়া শামী তৃতীয় খণ্ডের ৩০৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে- ফিতরার ক্ষেত্রে আদায়কারীর অবস্থান গ্রহণযোগ্য, যাদের পক্ষ থেকে দিচ্ছেন তাদের অবস্থান নয়।
এই মত ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এর এবং এটিই বিশুদ্ধ মত। কারণ যাদের পক্ষ থেকে তিনি আদায় করছেন, তারা আদায়কারীর অনুগত।
এর পর এ বিষয়ে হজরত ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহর এখতেলাফ উল্লেখের পর সারাংশে বলা হয়েছে- (ইবনে আবেদীন শামী বলেন) কিন্তু ফাতাওয়া তাতারখানিয়ায় আছে, সবার পক্ষ থেকে সেখানেই আদায় করবেন, যেখানে আদায়কারী অবস্থান করছেন।
এই মতটির ওপর ফতোয়া। এটিই ইমাম মোহাম্মদ (রহ.) এর মত। ইমাম আবু হানিফার মতও এ রকমই এবং এটিই বিশুদ্ধতম মত।
উপরোক্ত আলোচনা মৌলিকভাবে এ কথাই বোঝায় যে, জাকাত ও ফিতরা আদায়কারী যেখানে সম্পদ অর্জন করছেন, সেখানের হিসাবই ধর্তব্য। সেখানে দেয়াই ছিল মূল নিয়ম। দেশে আদায় করার বিষয়টি তাদের অতিরিক্ত চিন্তা। দেশের চিন্তা বাদ দিলে তারা সে দেশের পণ্য এবং মুদ্রায় জাকাত-ফিতরা প্রদান করতেন।
জাকাতদাতা যদি এক শহরে বসবাস করেন আর তার ব্যবসা চলে অন্য শহরে। তা হলে ব্যবসার শহরেই তার জাকাত আদায় করতে হবে। যদি তার অবস্থানের শহরে জাকাত আদায় করেন তা হলে মাকরুহ হবে।
কারণ তাদের বক্তব্য হচ্ছে- সম্পদ আহরণের স্থানই ধর্তব্য। এমনকি সম্পদের ওপর জাকাত যখন ফরজ হয়, সেই সময়টি ধর্তব্য, জাকাত আদায়ের সময় ধর্তব্য নয়। আর সম্পদের ওপর যে শহরে জাকাত ফরজ হয়, সেই শহরের দরিদ্রদের অধিকার যুক্ত হয়ে যায়।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে প্রবাসীদের সম্পদ আহরণের স্থানটা ধর্তব্য বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রবাসীদের স্থানের দ্রব্য ও মুদ্রামূল্য হিসাব করলে দরিদ্রদের উপকার বেশি, যা একটি মূলনীতি।
উপরোক্ত আলোচনায় এদিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রবাসীরা তাদের অবস্থানের পণ্য ও মুদ্রার মূল্যে জাকাত ও ফিতরা নির্ধারণ করবেন। এবং এ কথা সুস্পষ্ট যে তাদের অবস্থানের দরিদ্রদের জাকাত-ফিতরা দেবেন। এবং এটি আসলে মূলনীতি।
কিন্তু আমরা মাতৃভূমিতে জাকাত-ফিতরা দিতে উদ্বুদ্ধ করি কেন?
এই মর্মে ফাতাওয়া শামীর তৃতীয় খণ্ডের ৩০৪ নম্বর পৃষ্ঠায় আছে- জাকাতের সম্পদ স্থানান্তর করা মাকরুহ। তবে ৫ কারণে মাকরুহ হবে না।
প্রথমত আত্মীয়দের দেয়ার জন্য। এমনকি জহিরিয়া গ্রন্থে আছে- আত্মীয়স্বজনের প্রয়োজন সত্ত্বেও বাহিরে দানকারীর সদকা কবুল হবে না, যতক্ষণ না তাদের প্রয়োজন পূরণ করবে।
দ্বিতীয়ত অধিক প্রয়োজনবোধের কারণে। গ্রহীতার জন্য যদি পরম কল্যাণকর হয় অথবা তিনি পরম খোদাভীরু হন অথবা তিনি মুসলিম সমাজের কল্যাণে বেশি অবদান রাখেন।
তৃতীয়ত কাফের রাষ্ট্র থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রেরণের উদ্দেশ্যে।
চতুর্থত তালেবে এলেম বা ইসলামি জ্ঞান আহরণকারীর উদ্দেশ্যে পাঠানো হলে। আল মেরাজ গ্রন্থে আছে- অভাবী আলেমকে দান করা উত্তম।
পঞ্চমত ধর্মীয় কারণে সংসারে সময় দিতে পারছেন না এমন দুনিয়া ত্যাগীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলে।
আলোচ্য কারণসমূহ আমলে নিয়েই আমরা প্রবাসীদের মাতৃভূমিতে জাকাত-ফিতরা পাঠাতে বলি।