ফেরআউনের স্ত্রী আছিয়া(আঃ)-এর ঈমানদীপ্ত ঘটনা

ইতিহাস Contributor
ফিচার
আছিয়া(আঃ)
Photo by Irina Iriser from Pexels

আছিয়া আ’লাইহাস সালাম। নিজেকে খোদা দাবি করা, অত্যাচারী বাদশাহ ফেরআউনের স্ত্রী হলেও তিনি কোনো সাধারণ রমণী নন। আছিয়া(আঃ)-এর সাহসিকতা, শক্তি ও ধৈর্যের কারণে ইসলামী ইতিহাসে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

নারী আছিয়া(আঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান

তিনি এমন একজন নারী যিনি কখনো পরিবেশ-পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। বরং বিপন্ন পরিস্থিতিতেও তিনি উদ্ভাসিত ছিলেন আপন রূপে। হাজারো সমস্যার মাঝেও তিনি নিজ ঈমানের উপর অটুট ছিলেন এবং সে ঈমানের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত।

এই কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আছিয়া(আঃ)-এর নাম সেই সব মহান নারীদের সাথে স্মরণ করেছেন যারা ছিলেন দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মানিত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“অনেক পুরুষ পরিপূর্নতার শিখরে পৌছালেও মহিলাদের মধ্যে এই সংখ্যাটি ছিল কম। শুধু ইমরানের মেয়ে মরিয়াম এবং ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া সেটা পেরেছিল। এবং মহিলাদের মাঝে আয়েশার শ্রেষ্ঠত্ব এমন যেমন খাবারের মধ্যে সারীদ, যা সব থেকে উচ্চ পর্যায়ের।” (বুখারি)

মুসা(আঃ) এর অলৌকিক মুক্তি

আছিয়া(আঃ)-এর গল্পের শুরু মিশর শহর থেকে। যেখানে তিনি তাঁর স্বামী ফেরআউনের সাথে বাস করতেন। ফেরআউন ছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একজন অত্যাচারী শাসক। ফেরআউন এক ভবিষ্যত বক্তার কাছ থেকে জানতে পেরেছিল যে, বনী ইসরাঈল বংশদ্ভূত এক মহামানবের দ্বারা তার অত্যাচারী সাম্রাজ্যের পতন হবে। এ কথা শোনার সাথে সাথে সে সকল ছেলে শিশুকে হত্যার নির্দেশ দিল।

বনী ইসরাঈলী শিশুদের হত্যার সেই বিভীষিকয়াময় ঘটনা কুরআনেও উল্লেখিত হয়েছেঃ

“স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন আমরা ফেরআউনী দলের দাসত্ব থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দান করেছিলাম। তারা তোমাদের কঠিন যন্ত্রণায় নিমজ্জিত করে রেখেছিল। তোমাদের পুত্র সন্তানদের জবেহ করতে এবং তোমাদের কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখে দিত। মূলত এ অবস্থাটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য বড় কঠিন পরীক্ষা ছিল।” (আল কুরআন-২:৪৯)

একারণে, যখন হযরত মুসা(আঃ) জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁর মা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সন্তানের জীবন নিয়ে শঙ্কায় ভোগেন। এই ভয়ের মাঝে মহান আল্লাহ সাহসের সঞ্চারণ করলেন। আল্লাহ তাকে আশ্বস্ত করলেন, মুসা(আঃ) এর কিছুই হবে না এবং তাকে একটি বাক্সে করে নীলনদে রেখে আসতে বললেন এবং তাঁর মা তাই করলেন।

আছিয়া(আঃ)-এর কাছে মুসা(আঃ) এর প্রতিপালন

আল্লাহ তা’আলার ওয়াদা মোতাবেক শিশু মুসা নিরাপদে এসে পৌছালেন তীরে এবং সেখান থেকে তাঁকে আছিয়া(আঃ) সযত্নে তুলে ঘরে নিয়ে গেলেন। আছিয়া(আঃ) তাঁর স্বামী ফেরআউনকে অনেক কষ্টে রাজি করালেন মুসাকে নিজের কাছে প্রতিপালন করার জন্য।

অতঃপর, মুসা(আঃ) আছিয়া এবং ফেরআউনের ছায়ায় বেড়ে উঠতে থাকে। মুসা(আঃ) যখন বড় হয়ে নবী হলেন তখন যিনি স্বজাতিকে এক আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আহ্বান করলেন। কিন্তু অত্যাচারী ফেরআউনের ভয়ে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ তার এই ডাকে সাড়া দিল।

অবশেষে ফেরআউন তাঁর অত্যাচারের শেষ সীমায় চলে গেল এবং নিজেকে রব হিসেবে ঘোষণা করল। তার অত্যাচারের ভয়ে বনী ইসরাইলের অধিকাংশ অধিবাসীরা তাকে স্বীকার করতে বাধ্য হল।

যারা ফেরআউনকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখালো এবং মুসা(আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনল তাদের উপর নেমে আসল অকথ্য নির্যাতন। ফেরআউনের নিয়োজিত যাদুকরেরা যখন বুঝতে পারল মুসা(আঃ) প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর নবী তখন তাঁরা সবাইও এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল।

আছিয়া(আঃ)-এর ঈমান আনয়ন এবং অবিচলতা

এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর আছিয়া(আঃ)-ও হযরত মুসা(আঃ) এর উপর ঈমান আনলেন। তাঁর এই ঈমানের দৃঢ়তা এতটাই গভীর ছিল যে, এর জন্য তিনি নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। ফেরআউন যখন তার স্ত্রীর ঈমান আনয়নের ঘটনাজানতে পারল তখন আছিয়া(আঃ)-এর উপর নেমে আসল এক অমানবিক অত্যাচারের পাহাড়।

আল্লাহর উপর আছিয়া(আঃ)-এর ঈমানের এই অবিচলতা তাকে পৃথিবীর বুকে আদর্শের প্রতীক করে রেখেছে।

আল্লাহ বলেন, “আর ঈমানদারদের ব্যাপারে ফেরাউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করছেন। যখন সে দু’আ করলো, হে আমার রব, আমার জন্য তোমার কাছে জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দাও। আমাকে ফেরআউন ও তার অত্যাচারী কাজকর্ম থেকে রক্ষা করো এবং জালেম কওমের হাত থেকে বাঁচাও।” (আল কুরআন-৬৩:১১)

দুনিয়ার পরিবর্তে বেছে নিলেন আখিরাতকে

আছিয়া(আঃ) একজন রানী ছিলেন। তিনি পৃথিবীতে শাসন করে যাওয়া অন্যতম শক্তিশালী ও অত্যাচারী এক বাদশাহর স্ত্রী ছিলেন। তিনি অতুলনীয় সম্পদ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ঈমান আনয়নের পরে এ সবকিছুকে ত্যাগ করে তিনি জান্নাতে আসল বাড়িটি চিনেছিলেন।

এমন বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়েও আছিয়া(আঃ) ঈমান আনয়নের পর এই দুনিয়াবি জীবনের প্রতি সমস্ত মোহ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি তার স্বামীর গুনাহ দ্বারাও সংজ্ঞায়িত হননি । তার মন এবং তার আত্মা স্বামীর অত্যাচার কাছ থেকে স্বাধীন ছিল। এবং তার হৃদয়ে ফেরআউনের প্রতি কোনো বিশ্বাস ছিল না। আছিয়া(আঃ) তার স্বামীর অত্যাচারের কাছে মাথা নিচু করেননি , বরং বেছে নিয়েছিলেন আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর রাস্তায় নিজের জীবন উৎসর্গের পথকে।

আছিয়া(আঃ)-এর এই গল্পে আমরা এমন এক মহিলাকে খুজে পাই, যাকে এই দুনিয়ার চাকচিক্য আকর্ষণ করতে পারেনি। যে কিনা ক্ষণথায়ী এই দুনিয়ার সৌন্দর্য্যের লোভে না পড়ে বেছে নিয়েছিলেন আখিরাতের অনাবিল শান্তির আবাসস্থলকে।