ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদেররের কাহিনী

Abdelkader El Djezairi
Abdelkader El Djezairi (1808-1883) on engraving from 1859. Algerian Islamic scholar, Sufi, political and military leader that led the resistance against the French invasion. Engraved by unknown artist and published in Meyers Konversations-Lexikon, Germany,1859. Photo 27010848 © - Dreamstime.com

আজ আমরা আলোচনা করব আবদুল কাদের আল-জাজাইরি সম্পর্কে। যিনি ফ্রান্সের শত্রু হয়েও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে নায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

তিনি আলজেরিয়ায় ফরাসী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ব্যাপী প্রতিরোধমূলক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

শৈশব ও শিক্ষা

১৮০৮ সালে তিনি পশ্চিম আলজেরিয়ান শহর গুয়ান্তায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুহিউদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক বিদ্যালয়ে তাঁর ইলম অর্জনের হাতেখড়ি হয়। অল্প বয়স থেকেই তিনি জ্ঞান অর্জন করা শুরু করেন এবং ১৪ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি কুরআনের হাফেজ হয়ে যান।

১৮২৫ সালে তিনি তার পিতার সাথে হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা ও মদিনা সহ মধ্য-প্রাচ্যের বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং এর পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কাকেশীয় প্রতিরোধের নেতৃত্ব দানকারী ইমাম শামিলের সাথে তাঁর সাক্ষাত, আবদুল কাদেরের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।

তাঁর হজ্জ্ব থেকে ফিরে আসার খুব অল্প সময় পরে ফরাসিরা আলজেরিয়া আক্রমণ করে। এ সময় তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এছাড়া পশ্চিম আলজেরিয়ান উপজাতিরা এই প্রতিরোধের ব্যাপারে মুসলিম আলেমদের মাধ্যমে উত্সাহিত হয়েছিল। তাই ফরাসী সেনাবাহিনী যখন ওরানে পৌঁছায়, তখন আবদুল কাদেরের পিতা মুহিউদ্দিনকে অধিকৃত শহরটির বিরুদ্ধে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হয়।

ফরাসি আক্রমণের বিরোধিতা

আবদুল কাদের এবং তার পিতা শহরের বাইরে প্রথম যে হামলা হয়েছিল সেই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বছরখানেক পর, আবদুল কাদেরকে মুসলিম বাহিনীর আমির হিসাবে নির্বাচিত করা হয় এবং এখান থেকেই ফরাসিদের বিরুদ্ধে তাঁর সুদীর্ঘ ১৫ বছরের প্রতিরোধমূলক যুদ্ধের সূচনা হয়।

আবদুল কাদের পশ্চিম আলজেরিয়ার উপজাতিদেরকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। তাঁর বাহিনীর দক্ষ গেরিলা আক্রমণ ও কৌশলগত শৃঙ্খলার সংমিশ্রনে ১০ বছর সময়কালের মধ্যেই তাঁরা ইউরোপের অন্যতম উন্নত সেনাবাহিনীকে বেশ কয়েকটি অবমাননাকর পরাজয় বরণ করাতে সক্ষম হন।

এই প্রতিরোধের সূচনাকাল থেকেই, আবদুল কাদেরের গ্রহীত ইসলামী নীতিসমূহ কেবল আলজেরিয়াতেই নয়, ইউরোপীয় থেকে শুরু করে তার ফরাসী শত্রুদের কাছ থেকেও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

খাদ্য, চিকিত্সা, যত্ন ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে, আবদুল কাদের ফরাসী যুদ্ধবন্দীদের সাথে তার নিজ বাহিনীর লোকদের মতই আচরণ করতেন। একসময় তিনি শুধুমাত্র এই কারণে সকল বন্দীদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন কারণ তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ছিল না!

ব্রিটিশ আর্মি অফিসার, চার্লস হেনরি চার্চিল তাঁর সম্পর্কে বলেন, “তিনি তাঁর যুদ্ধ-বন্দীদের সাথে যে উদার, কোমল ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছেন তা কোনো যুদ্ধের ইতিহাসে সাধারণত দেখা মেলে না।”

তবে আবদুল কাদেরের এই উদার নীতি ও করুণা তাঁর শত্রুরা কখনও তাঁর বাহিনীর বন্দীদের সাথে দেখায়নি।

দীর্ঘ ১০ বছর প্রতিরোধের পর, ফ্রান্স আবদুল কাদিরের গেরিলা যুদ্ধের বিপরীতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা শুরু করে। ফরাসী সেনারা পশ্চিম আলজেরিয়ার গ্রামীণ উপজাতিদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা শুরু করে। গণহত্যা ও গণধর্ষণ সহ এমন কোনো গর্হিত কাজ ছিল না যা তারা সেখানে করে নি।

আবদুল কাদেরের শাসনকে দুর্বল করার জন্য তারা গ্রামাঞ্চলের কৃষিজমি পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়।

তাঁর প্রতিরোধ্য দুর্গটি ধ্বংস হয়ে গেলে তিনি আলজেরিয়ার পূর্ব দিকে লড়াই চালিয়ে যান। তবে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর প্রতিরধের পর আবদুল কাদের ২১ ডিসেম্বর ১৮৪৭ সালে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

স্বাধীনতা যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি

তবে আবদুল কাদেরের বীরত্বের এখানেই শেষ হয়নি।

ফ্রান্সে ৪ বছরেরও বেশি কারাদণ্ডে ভোগের পর তৃতীয় ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রপতি নেপোলিয়ন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড লন্ডেরির আবেদন ও চাপের কারণে আবদুল কাদের সহ সকল বন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত আবদুল কাদের শেষ পর্যন্ত দামেস্কে চলে আসেন। এবং সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবিরাম সংগ্রামের জন্য তাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

১৮৬০ সালের জুলাই মাসে দামেস্কের খ্রিস্টান কোয়ার্টারে ড্রুজ হামলা করে। এই আক্রমণ শুরু হওয়ার পরে, আবদুল কাদের তাঁর বাড়িতে বিপুল সংখ্যক খ্রিস্টানকে আশ্রয় প্রদান করেন।

আবদুল কাদের সারা জীবন স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি নিজের নামকে সমুন্নত করেছিলেন।

ফ্রান্স তাকে অভূতপূর্ব প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখলেও বিশ্বজুড়ে অনেকে তাকে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই দেখে।

আবদুল কাদের প্রতিরোধমূলক যুদ্ধে নেতৃত্বদানের পাশাপাশি তাঁর করুণার ফলে তিনি ইমাম শামিল, অটোমান সুলতান, আব্রাহাম লিংকন এবং পোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম উভয় ধরণের নেতাদের কাছ থেকে সম্মান অর্জন করেন।

দুর্বলদের সুরক্ষা প্রদান থেকে শুরু করে নৃশংস দখলদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, আবদুল কাদেরের গল্প আজ অবধি বিশ্বের অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।